নিজস্ব প্রতিবেদক | ক্রাইম ক্রনিকল
রাজধানীর পল্লবীতে আট বছর বয়সী স্কুলছাত্রী রামিসা আক্তারকে ধর্ষণের পর গলা কেটে হত্যার ঘটনায় দায়ের করা মামলায় প্রধান আসামি সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আদালত। একই সঙ্গে সোহেল রানাকে পাঁচ লাখ টাকা এবং স্বপ্না আক্তারকে দুই লাখ টাকা অর্থদণ্ড করা হয়েছে।
রোববার (৭ জুন) বেলা ১১টা ৩৭ মিনিটে ঢাকার শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীন এ রায় ঘোষণা করেন। রায় ঘোষণার সময় আদালতে কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়। এর আগে সকাল পৌনে ১১টার দিকে সোহেল রানা (৩১) ও স্বপ্না আক্তারকে (২৬) আদালতে আনা হয়। প্রথমে তাদের ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের হাজতখানায় রাখা হয়, পরে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হলে বিচারক রায় ঘোষণা করেন। বেলা ১১টা ৪১ মিনিটে আদালতের কার্যক্রম শেষ হয়।

মামলার নথি ও তদন্ত সূত্রে জানা যায়, গত ১৯ মে রাজধানীর পল্লবীর একটি বাসা থেকে দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী রামিসা আক্তারের খণ্ডিত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। তদন্তে উঠে আসে, প্রতিবেশী সোহেল রানা শিশুটিকে তার ঘরে নিয়ে ধর্ষণ করে। পরে গলা কেটে হত্যা করা হয়। অপরাধ গোপন করতে মরদেহ টুকরো করারও চেষ্টা করা হয়েছিল বলে তদন্তে উল্লেখ করা হয়।
ঘটনার পরদিন রামিসার বাবা আব্দুল হান্নান মোল্লা পল্লবী থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। মামলায় সোহেল রানা, তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তার এবং অজ্ঞাতনামা আরও একজনকে আসামি করা হয়।
মামলাটি তদন্ত করে ঘটনার মাত্র পাঁচ দিনের মাথায়, ২৪ মে পল্লবী থানার উপপরিদর্শক ও তদন্ত কর্মকর্তা অহিদুজ্জামান ভূঁইয়া আদালতে চার্জশিট দাখিল করেন। চার্জশিটে সোহেল রানার বিরুদ্ধে ধর্ষণ, হত্যা ও আলামত নষ্টের অভিযোগ আনা হয়। অন্যদিকে স্বপ্না আক্তারের বিরুদ্ধে আলামত নষ্ট, মিথ্যা তথ্য প্রদান এবং অপরাধে সহায়তার অভিযোগ আনা হয়। একই দিন আদালত মামলাটি বিচারের জন্য শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালে পাঠানোর নির্দেশ দেন।
ঈদুল আজহার ছুটির কারণে মামলার কার্যক্রম কিছুদিন স্থগিত থাকলেও ১ জুন অভিযোগ গঠনের মাধ্যমে বিচার শুরু হয়। পরদিন ১৭ জন সাক্ষীর মধ্যে ১৬ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ করা হয়। সাক্ষীদের মধ্যে নিহত শিশুর বাবা-মা, বোন, আত্মীয়স্বজন এবং তদন্তসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা ছিলেন। ৩ জুন আসামিদের আত্মপক্ষ সমর্থনের শুনানি অনুষ্ঠিত হয় এবং ৪ জুন মামলার যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষ হয়।
যুক্তিতর্কের সময় প্রসিকিউশন আদালতে দাবি করে, সাক্ষ্যপ্রমাণ, জবানবন্দি ও অন্যান্য উপস্থাপিত তথ্যের মাধ্যমে আসামিদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে। তাই তারা উভয়ের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ডের আবেদন জানান।
অন্যদিকে আসামিপক্ষ সাজা লঘুর আবেদন করে যুক্তি দেয়, মামলার চার্জশিট মূলত প্রধান আসামির স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দির ওপর ভিত্তি করে তৈরি হয়েছে। তারা আরও দাবি করেন, হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত কথিত অস্ত্রের ফরেনসিক পরীক্ষা করা হয়নি।
তবে উভয় পক্ষের যুক্তি, সাক্ষ্যপ্রমাণ ও মামলার নথিপত্র পর্যালোচনা করে আদালত সোহেল রানা ও স্বপ্না আক্তারকে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করেন। একই সঙ্গে অর্থদণ্ডও আরোপ করেন।
তদন্ত, অভিযোগ গঠন, সাক্ষ্যগ্রহণ, যুক্তিতর্ক এবং রায়—সব মিলিয়ে মাত্র কয়েকটি কার্যদিবসের মধ্যে মামলার বিচার সম্পন্ন হওয়ায় এটি দেশের সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে দ্রুত নিষ্পত্তিকৃত আলোচিত ধর্ষণ ও হত্যা মামলাগুলোর একটি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট আইনজীবীদের অনেকেই বলছেন, ধর্ষণ ও হত্যা মামলায় এত দ্রুত বিচার ও রায় ঘোষণার নজির তাদের স্মরণে নেই।
রায়ের মাধ্যমে বহুল আলোচিত এই মামলার বিচারিক পর্ব শেষ হলেও উচ্চ আদালতে আপিলের সুযোগ থাকায় মামলার আইনি প্রক্রিয়া এখনও অব্যাহত থাকবে।