স্টাফ রিপোর্টার | ক্রাইম ক্রনিকল
পাকিস্তানে ধর্ম অবমাননার অভিযোগে মামলা কমেছে দুই-তৃতীয়াংশ। শুনতে নিছক একটা পরিসংখ্যান মনে হতে পারে, কিন্তু ব্যাপারটা তার চেয়ে অনেক বড়।
কারণ যাদের আজ দমন করা হচ্ছে, একসময় তাদেরই আগলে রেখেছিল রাষ্ট্র। অন্তত বিশ্লেষকরা বহু বছর ধরে সেই অভিযোগই করে আসছেন।
গত মাসে করাচির এক গলিতে যা ঘটেছিল, সেটা দিয়েই বদলটা সবচেয়ে ভালো বোঝা যায়। এক খ্রিষ্টান পরিবারের বিরুদ্ধে ব্লাসফেমির অভিযোগ তুলে জড়ো হয়েছিল শত শত মানুষ।
চার নারী আর এক শিশুকে বাঁচাতে পুলিশের হাতে সময় ছিল মিনিট কয়েক। ১৯৯০ সাল থেকে পাকিস্তানে এমন অভিযোগ ঘিরে প্রায় ৯০টি গণপিটুনিতে মানুষ মারা গেছে, যার বেশিরভাগেরই শুরুটা ছিল ঠিক এভাবে।
কিন্তু সেদিন কিছু একটা মিলছিল না। ‘ব্লাসফেমারদের মৃত্যু হোক’ স্লোগান উঠেছে ঠিকই, অথচ ভিড়ের ভেতর সেই চেনা মুখগুলো নেই — যারা এমন সময় আগুনে ঘি ঢালে।
পুলিশ কর্মকর্তা সাঙ্ঘার আলী মালিক কোরআনের আয়াত পড়ে জনতাকে বোঝান, আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার অধিকার কোনো ধর্মই কাউকে দেয়নি। তদন্তের আশ্বাস পেয়ে ভিড় ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়।

১৭ জুলাই ২০২৬: করাচিতে রয়টার্সকে সাক্ষাৎকার দিচ্ছেন এসএসপি সাঙ্ঘার আলী মালিক।
পরে প্রাথমিক তদন্তে জানা যায়, অভিযোগটাই ছিল মিথ্যা।
প্রশ্নটা ‘কী কমল’ নয়, ‘কেন কমল’
রয়টার্সের অনুসন্ধান বলছে, সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরের নেতৃত্বে চালানো এই অভিযানের পেছনে নীতিনৈতিকতার চেয়ে বেশি কাজ করেছে ঠান্ডা মাথার হিসাব।
সবচেয়ে বড় চাপটা এসেছে পকেট থেকে। পাকিস্তানের রপ্তানির প্রায় এক-তৃতীয়াংশ যায় ইউরোপে, আর কট্টরপন্থিদের ফ্রান্সবিরোধী তৎপরতায় সেই শুল্কছাড় ঝুঁকিতে পড়ছিল।
দুই সরকারি সূত্রের বরাতে জানা যায়, ২০২৫ সালের গ্রীষ্মেই কর্মকর্তারা টের পান, বাজারটা হাতছাড়া হলে ধুঁকতে থাকা অর্থনীতি আর সামলানো যাবে না।
দ্বিতীয় চাপটা কূটনৈতিক। ওয়াশিংটনের সঙ্গে সম্পর্ক ঝালাই করা, খনিজ খাতে মার্কিন বিনিয়োগ টানা, নিজেকে দায়িত্বশীল পারমাণবিক রাষ্ট্র হিসেবে হাজির করা — এসবের সঙ্গে রাস্তায় গণপিটুনির দৃশ্য একেবারেই যায় না।
মুনির নিজে ট্রাম্পের সঙ্গে গড়ে ওঠা ব্যক্তিগত সম্পর্ককেও এখানে কাজে লাগাচ্ছেন। তাঁর ঘনিষ্ঠ এক সূত্রের ভাষ্য, সেনাপ্রধান পরিষ্কার বুঝে গেছেন — এই গোষ্ঠীগুলোকে সঙ্গে নিয়ে পাকিস্তান এগোতে পারবে না।

১৭ জুলাই ২০২৬: ধর্ম অবমাননার অভিযোগে করাচিতে এক খ্রিষ্টান পরিবারের বাড়ির সামনে পাহারারত পুলিশ। ছবি: রয়টার্স
তৃতীয় চাপটা নিরাপত্তার, আর সম্ভবত সবচেয়ে জরুরি। বেলুচিস্তান আর খাইবার পাখতুনখোয়ায় বিদ্রোহ বাড়ছেই।
এই সশস্ত্র গোষ্ঠী আর ধর্মীয় কট্টরপন্থিরা সরাসরি এক না হলেও, লোক টানে তারা একই জায়গা থেকে — বেকার, ক্ষুব্ধ, উগ্রপন্থায় ঝুঁকে পড়া তরুণদের ভেতর থেকে।
কাবুলের সঙ্গে বিচ্ছেদের ধাক্কা
আরেকটা বড় কারণ আফগানিস্তান। এক সময়ের মিত্র তালেবানকে এখন ইসলামাবাদ দোষারোপ করছে নিজ ভূখণ্ডে সন্ত্রাসী তৎপরতায় মদদ দেওয়ার জন্য। তালেবান অবশ্য অভিযোগটিকে ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দিয়েছে।
সিঙ্গাপুরের এস রাজারত্নম স্কুলের বিশ্লেষক আবদুল বাসিত মনে করেন, অতীতে তালেবানকে সমর্থন দেওয়া নিয়ে পাকিস্তানের ভেতরে যে আত্মসমালোচনা শুরু হয়েছে, এই অভিযান তারই ফল। তাঁর সোজাসাপ্টা মূল্যায়ন — ধর্মীয় গোষ্ঠীগুলো এখন আর কারও সুনজরে নেই।
সংখ্যায় যা দেখা যাচ্ছে
হিউম্যান রাইটস কমিশন অব পাকিস্তানের হিসাবে, চলতি বছর এখন পর্যন্ত ব্লাসফেমির মামলা হয়েছে মাত্র ১৩টি। আগের বছরগুলোর একই সময়ের তুলনায় যা প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ কম।
সংঘাত পর্যবেক্ষক সংস্থা এসিএলইডির তথ্য আরও স্পষ্ট। ২০২১ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত বছরে গড়ে সাতটির বেশি ব্লাসফেমি-দাঙ্গা হতো, গত ১২ মাসে হয়েছে মাত্র একটি।
সবচেয়ে বড় কট্টরপন্থি দল তেহরিক-ই-লাব্বাইক পাকিস্তান বা টিএলপি নিষিদ্ধ হয়েছে গত বছরের শেষদিকে। নেতাদের অনেকে কারাগারে, মসজিদ সিলগালা, ব্যাংক হিসাব জব্দ। এক সরকারি নথিতে বলা হয়েছিল, দলটি কেবল ভেতরের শান্তিই নষ্ট করেনি, বিদেশে দেশের মুখও পুড়িয়েছে। টিএলপির মুখপাত্র অবশ্য নিষেধাজ্ঞাকে অবৈধ ও অসাংবিধানিক বলেই দাবি করে আসছেন।
স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী তালাল চৌধুরীর ভাষায়, সরকার আর সেনাবাহিনী এবার এক অবস্থানে — দেশকে জিম্মি করতে চাইলে কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না।
তবু সন্দেহ যায় না কেন
এই কড়াকড়ি কতদিন টিকবে, সেটাই এখন আসল প্রশ্ন। কারণ ধর্মভিত্তিক চাপগোষ্ঠীকে কোণঠাসা করার নজির পাকিস্তানে এটাই প্রথম নয়।
এর আগে লস্কর-ই-তৈয়বা আর জইশ-ই-মুহাম্মদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল। তবে সেটা এসেছিল আন্তর্জাতিক আর্থিক নজরদারি সংস্থা এফএটিএফের চাপে, নিজের তাগিদে নয়।
আর টিএলপির জন্মবৃত্তান্ত জানলে সন্দেহটা আরও ঘন হয়। ২০১১ সালে ব্লাসফেমির অভিযোগে অভিযুক্ত এক খ্রিষ্টান নারীর পাশে দাঁড়ানোয় পাঞ্জাবের গভর্নর সালমান তাসিরকে গুলি করে হত্যা করেন তাঁরই দেহরক্ষী।
সেই ঘাতকের কারাবাসের সময়ই, ২০১৫ সালে, জন্ম নেয় টিএলপি। দল গঠনের পেছনে সামরিক গোয়েন্দাদের হাত ছিল কি না — সেই সন্দেহ শুরু থেকেই ছিল।
২০১৭ সালে টিএলপির নেতৃত্বে সহিংস দাঙ্গার পর তৎকালীন সেনাপ্রধান জেনারেল কামার জাভেদ বাজওয়া বিক্ষোভকারীদের ডেকেছিলেন ‘আমাদেরই লোক’ বলে। কথাটা আজও পাকিস্তানের রাজনীতিতে ঘুরেফিরে আসে।
পরে সুপ্রিম কোর্ট গোয়েন্দা সংস্থা আর সেনাবাহিনীকে রাজনীতি থেকে দূরে থাকতে বললেও, টিএলপির সঙ্গে তাদের যোগসূত্র চূড়ান্তভাবে প্রমাণ হয়নি।
সেই ২০১৭ সালের দাঙ্গার সময় পাকিস্তান সরকারের সন্ত্রাসবিরোধী প্রধান ছিলেন ইহসান গনি। তাঁর আশঙ্কা, রাজনৈতিক প্রয়োজন বদলালে দলটি আবার পুরোদমে ফিরে আসতে পারে।
তাঁর কথাটাই সবচেয়ে বেশি ভাবায় — রাষ্ট্র বছরের পর বছর ধরে যা লালন করেছে, তা ইচ্ছেমতো সুইচ টিপে চালু বা বন্ধ করা যায় না।
যা বদলায়নি
করাচির ঘটনাটাই আসলে গোটা ছবিটা ধরিয়ে দেয়। ভিড় জমেছিল, স্লোগানও উঠেছিল। শুধু সংগঠিত উসকানিদাতারা ছিলেন না বলেই সেদিন রক্ত ঝরেনি। মানে ভেতরের রাগটা কোথাও যায়নি, শুধু তাকে সংগঠিত করার লোকগুলো আপাতত সরে গেছে।
আইনও যেখানে ছিল সেখানেই আছে। ব্লাসফেমির সর্বোচ্চ শাস্তি এখনো মৃত্যুদণ্ড। বিষয়টা এত স্পর্শকাতর যে নিছক সন্দেহ থেকেও দাঙ্গা বেধে যেত।
মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলছে, ভয়ে বিচারক আর আইনজীবীরা মামলা নিতে চাইতেন না বলে ভুক্তভোগীর পরিবার বছরের পর বছর বিচার পেত না।
সংখ্যালঘুদের জন্য বদলটা তাই একইসঙ্গে স্বস্তির আর অবিশ্বাসের। অতীতে ব্লাসফেমি-সংক্রান্ত হত্যার অভিযুক্তদের — এমনকি পুলিশ সদস্যদেরও — কখনো ফুল ছিটিয়ে, কখনো লাল গালিচা বিছিয়ে বরণ করা হয়েছে।
স্টিমসন সেন্টারের দক্ষিণ এশিয়া কর্মসূচির পরিচালক এলিজাবেথ থ্রেলকেল্ড প্রশ্নটা রেখেছেন সরাসরি — পাকিস্তান এই মনোযোগ ধরে রাখতে পারবে তো, আর রাখতে চাইবে তো?
করাচিতে উদ্ধার পাওয়া সেই খ্রিষ্টান নারীদের একজন রয়টার্সকে বলেছেন, শরীরটা এখন নিরাপদ। কিন্তু ভয়টা এখনো যায়নি।
এই এক বাক্যেই গোটা পরিবর্তনের সীমারেখা টানা হয়ে গেছে। রাষ্ট্র আপাতত ঢাল হয়ে দাঁড়িয়েছে ঠিকই — কিন্তু ঢালটা সরে গেলে কী হবে, তার নিশ্চয়তা কেউ দিতে পারছে না।