আন্তর্জাতিক ডেস্ক | ক্রাইম ক্রনিকল
কিশোর-কিশোরীদের সামরিক প্রশিক্ষণ দেওয়া ব্রিটেনের একটি প্রতিষ্ঠানে ধর্ষণ ও ধারাবাহিক যৌন নিপীড়নের অভিযোগ সামনে এনেছেন সাবেক চার নারী রিক্রুট।
ব্রিটিশ সম্প্রচারমাধ্যম বিবিসির অনুসন্ধানে উঠে এসেছে এসব ভয়াবহ অভিজ্ঞতা।
উত্তর ইয়র্কশায়ারের হ্যারোগেটে অবস্থিত আর্মি ফাউন্ডেশন কলেজে (এএফসি) গত পাঁচ বছরের মধ্যে প্রশিক্ষণ নেওয়া এই নারীরা জানান, ঘটনাগুলো যখন ঘটে তখন তাঁদের প্রত্যেকের বয়স ছিল ১৭ বছর।

বর্তমানে এএফসির ৮৮৯ জন জুনিয়র সৈনিকের মধ্যে ৭০ জন নারী সৈনিক রয়েছেন। ছবি: বিবিসি
প্রথমবারের মতো মুখ খোলা এই চারজনের ভাষ্য, প্রতিষ্ঠানটিতে নারীবিদ্বেষ ও যৌন সহিংসতার একটি বিপজ্জনক সংস্কৃতি গেড়ে বসেছে।
বিবিসি যাঁকে ‘টিলি’ ছদ্মনামে উল্লেখ করেছে, সেই তরুণী জানান, ১৭ বছর বয়সে সহকর্মী একাধিক জুনিয়র সৈনিক তাঁকে ধর্ষণ করে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা চলা ওই নির্যাতনের সূত্রপাত হয় একজনের কক্ষে সাধারণভাবে ডেকে নেওয়ার মধ্য দিয়ে।
তাঁর অভিযোগ, সম্মতি ছাড়াই তাঁর পোশাক খোলা হয় এবং একাধিক ব্যক্তি আপত্তিকর স্পর্শ ও মন্তব্য করতে থাকে। তাঁকে একজন মানুষ নয়, বরং একটি ‘বস্তু’ হিসেবে সম্বোধন করা হচ্ছিল বলেও তিনি জানান।
অভিযোগের তালিকায় ধর্ষণ ছাড়াও রয়েছে যৌন হয়রানি, যৌন নিপীড়ন এবং গোপনে দেখা বা ভিডিও করার (ভয়েরিজম) মতো ঘটনা।
তথ্য অধিকার আইনে পাওয়া নথিও ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরছে। বিবিসির অনুসন্ধান বলছে, জুন পর্যন্ত এক বছরে কেবল এই কলেজ-সংশ্লিষ্ট ১৬টি যৌন অপরাধের অভিযোগ পেয়েছে নর্থ ইয়র্কশায়ার পুলিশ।
এর আগে কমন্স প্রতিরক্ষা নির্বাচিত কমিটির শুনানিতে লেবার এমপি এমা লুয়েল জানিয়েছিলেন, ২০২১ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে ১৮ বছরের কম বয়সীদের বিরুদ্ধে সংঘটিত যৌন অপরাধ নিয়ে এএফসিতে ১২২টি তদন্ত হয়েছে, যার ৮০টিই ছিল যৌন নিপীড়নের ঘটনা।

২০২১ সালের জুলাইয়ে অফিসার মাইকেল ওয়েবারের শ্লীলতাহানির শিকার হওয়ার পাঁচ মাস পর লার্কহিল ব্যারাকে মৃত পাওয়া যায় গানার জেসলি বেককে।ছবি: বিবিসি
তিনি আরও জানান, গত পাঁচ বছরে কলেজটির কর্মীদের বিষয়ে নর্থ ইয়র্কশায়ার কাউন্সিলের কাছে ৮৯টি সেফগার্ডিং নোটিফিকেশন জমা পড়েছে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এএফসির কয়েকজন প্রশিক্ষক সহিংসতা ও যৌন অপরাধের দায়ে কোর্ট মার্শালে দণ্ডিত হয়েছেন – এর মধ্যে করপোরাল ড্যানিয়েল কনওয়ে ও করপোরাল সাইমন বার্ট্রামের মামলা উল্লেখযোগ্য।
তবে নতুন করে সামনে আসা অভিযোগগুলোর সঙ্গে এই ব্যক্তিদের সরাসরি সংশ্লিষ্টতা নেই।
সেনাবাহিনীর এক মুখপাত্র বৃহস্পতিবার বলেন, এসব প্রতিবেদন অত্যন্ত উদ্বেগজনক ও গুরুতর। তাঁর ভাষ্য, অগ্রহণযোগ্য ও অপরাধমূলক আচরণের কোনো স্থান সশস্ত্র বাহিনীতে নেই এবং তা প্রতিষ্ঠানের আদর্শের সম্পূর্ণ পরিপন্থী।
কলেজে এ ধরনের ঘটনার ভুক্তভোগী কিংবা প্রত্যক্ষদর্শীদের এগিয়ে এসে অভিযোগ জানানোর আহ্বানও জানিয়েছে সেনাবাহিনী।
মুখপাত্র জানান, ভুক্তভোগীদের সহায়তায় সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বেশ কিছু পরিবর্তন আনা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে সেনা চেইন অব কমান্ডের বাইরে স্বাধীনভাবে পরিচালিত ‘ডিফেন্স সিরিয়াস ক্রাইম কমান্ড’ গঠন, যেখানে বিচারপ্রক্রিয়ায় ভুক্তভোগীদের পাশে থাকার জন্য বিশেষায়িত দল রয়েছে।
তবে সেনাবাহিনী একই সঙ্গে দাবি করেছে, চলতি বছরের জানুয়ারিতে শিশুবিষয়ক কমিশনার ও সেফগার্ডিং কর্তৃপক্ষের পরিদর্শনে কলেজটির ‘সেবাধর্মী সংস্কৃতি’ এবং অভিযোগ জানাতে জুনিয়র সৈনিকদের আস্থার বিষয়টি স্বীকৃতি পেয়েছে।
শিক্ষা পরিদর্শন সংস্থা অফস্টেড কলেজটির শৃঙ্খলাব্যবস্থাকে ‘আউটস্ট্যান্ডিং’ রেটিং দিয়েছে বলেও উল্লেখ করা হয়।
এমন সময়ে অভিযোগগুলো প্রকাশ্যে এলো, যখন বৃহস্পতিবার কলেজটিতে অনুষ্ঠিত হচ্ছে সমাপনী কুচকাওয়াজ। প্রায় পাঁচ হাজার স্বজনের উপস্থিতিতে ৯০০ জুনিয়র সৈনিকের প্রাথমিক প্রশিক্ষণ সমাপ্তির আয়োজন এটি।
ব্রিটিশ সশস্ত্র বাহিনীতে নারীদের নিরাপত্তা নিয়ে দীর্ঘদিনের উদ্বেগেরই সর্বশেষ সংযোজন এএফসির এই অভিযোগগুলো।
২০২১ সালে এমপিদের এক পর্যালোচনায় ধর্ষণ, অপ্রাপ্তবয়স্কদের যৌন শোষণ এবং মাদক প্রয়োগ করে নারীদের ওপর হামলার ঘটনা উঠে এসেছিল।
সাবেক এমপি সারাহ অ্যাথারটনের নেতৃত্বে পরিচালিত ওই পর্যালোচনার সিদ্ধান্ত ছিল – সামরিক অভিযোগ নিষ্পত্তির ব্যবস্থা এতটাই দুর্বল যে নারীরা ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
নারী অধিকার সংগঠন ও সামরিক নজরদারি সংস্থাগুলো এখন অভিযোগগুলোর স্বাধীন তদন্ত দাবি করছে। তাদের বক্তব্য, ব্যবস্থার প্রতি আস্থা ফেরাতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি অপরিহার্য।
তথ্যসূত্র: বিবিসি, গেজেট অ্যান্ড হেরাল্ড, ইয়র্কশায়ার লাইভ