স্পোর্টস ডেস্ক | ক্রাইম ক্রনিকল


শেষ বাঁশি বাজার সঙ্গে সঙ্গেই যেন থমকে গেল একটি যুগ। শেষ মুহূর্তে মিকেল মেরিনোর গোলে স্পেনের কাছে হেরে বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নেয় পর্তুগাল। ক্যামেরার ফোকাস তখন একজনের দিকে— ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো। চোখে হতাশা, মুখে নীরবতা, আর কিছুক্ষণ পর অশ্রুতে ভেঙে পড়া এক একাকী যোদ্ধা, সময়ের কাছে হার মানা কিংবদন্তি। ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা এই তারকার জন্য এমন বিদায় নিঃসন্দেহে আবেগঘন এবং বেদনাদায়ক।




রোনালদোর ক্যারিয়ারে অর্জনের তালিকা দীর্ঘ। ক্লাব ও আন্তর্জাতিক ফুটবলে অসংখ্য রেকর্ড, শিরোপা এবং অবিস্মরণীয় মুহূর্ত উপহার দিয়েছেন তিনি। তবে বিশ্বকাপ শিরোপা তাঁর অধরাই থেকে গেল। এটিই ছিল তাঁর শেষ বিশ্বকাপ, আর সেই অধ্যায় শেষ হলো পরাজয় ও অশ্রুর মধ্য দিয়ে।


২০২২ বিশ্বকাপের হতাশার পরও হাল ছাড়েননি রোনালদো। বয়সকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে আরও চার বছর নিজেকে প্রস্তুত করেছিলেন। কিন্তু সময়ের বাস্তবতা শেষ পর্যন্ত এড়ানো যায়নি। টুর্নামেন্টজুড়ে তিনি নিজের সর্বোচ্চ চেষ্টা করলেও আগের মতো গতি, ধার কিংবা ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার সেই পরিচিত ক্ষমতা আর দেখা যায়নি।


এই বিশ্বকাপে রোনালদো ছিলেন এই পর্তুগাল দলে একটি বিচ্ছিন্ন দ্বীপ। সতীর্থরা তাকে সহজে কেউ পাস দেয় না, তিনি প্রতিপক্ষের মার্কারকে ছিটকে সামনে এগোতে পারেন না এবং গুরুত্বপূর্ণ সময়ে সৃষ্টি করতে পারেন না ব্যক্তিগত কোনো জাদুকরি মুহূর্তও।


এমনকি ম্যাচ শেষে মাঠে যখন কান্নায় ভেঙে পরেন তখনও সতীর্থদের খুব একটা পাত্তা পেলেন না! কেউ কেউ নির্লিপ্তভাবে এসে হাত মিলিয়ে আলিঙ্গন করে গেল। তবে তা এতই নির্লিপ্ত যে এর চেয়ে এড়িয়ে যাওয়াই বরং ভালো!




তবে পর্তুগালের বিদায়ের দায় কেবল একজন খেলোয়াড়ের ওপর চাপানো কঠিন। ফুটবল দলগত খেলা, আর এই ব্যর্থতার পেছনে ছিল একাধিক কারণ।


সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন উঠছে কোচ রবার্তো মার্টনেজের কৌশল নিয়ে। ম্যাচে যখন আক্রমণে নতুন উদ্যমের প্রয়োজন ছিল, তখনও তিনি পুরো ৯০ মিনিট রোনালদোকে মাঠে রাখেন। অথচ বেঞ্চে ছিলেন আগের ম্যাচে গোল করা গনসালো রামোস। ম্যাচের পরিস্থিতি অনুযায়ী পরিবর্তন আনতে দেরি হওয়ায় কোচের সিদ্ধান্ত নিয়ে সমালোচনা শুরু হয়েছে।


একই সঙ্গে আলোচনায় এসেছে দলের সামগ্রিক পারফরম্যান্সও। ব্রুনো ফার্নান্দেজ, ভিতিনহা, হোয়াও নেভেস এবং নুনো মেন্ডেস এর মতো প্রতিভাবান ফুটবলারদের কাছ থেকে প্রত্যাশা ছিল আরও বেশি। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তগুলোতে দল হিসেবে তারা নিজেদের সেরাটা তুলে ধরতে পারেনি।


এই বিশ্বকাপে রোনালদোর ব্যক্তিগত পারফরম্যান্সও ছিল আলোচনার বিষয়। উজবেকিস্তানের বিপক্ষে দুটি গোল এবং ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে একটি পেনাল্টি গোল করলেও নকআউট পর্বে তিনি ম্যাচের গতিপথ বদলে দিতে পারেননি। একই সঙ্গে বিশ্বকাপে ব্যক্তিগতভাবে তাঁর পরাজয়ের সংখ্যা আটে পৌঁছেছে, যা একটি অনাকাঙ্ক্ষিত।  


সাবেক ইংল্যান্ড স্ট্রাইকার ক্রিস সুটন বলেন, আধুনিক ফুটবলে একজন সেন্টার ফরোয়ার্ডের কাছ থেকে যে গতি, নড়াচড়া ও ধারাবাহিক চাপ সৃষ্টি করার প্রত্যাশা থাকে, এই টুর্নামেন্টে রোনালদো তা দেখাতে পারেননি। অন্যদিকে ওয়েন রুনির মতে, রোনালদোর বিদায়ের মধ্য দিয়েই পর্তুগালের নতুন এক যুগের সূচনা হলো, যেখানে নতুন প্রজন্মের ফুটবলারদের নেতৃত্ব নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে।


সোনালি ট্রফিটি অধরাই থেকে গেল। মুকুটের সবচাইতে আকাঙ্ক্ষিত, পরম আরাধ্য পালকটিই ছুঁয়ে দেখা হল না। ছয়বার সুযোগ পেয়েছিলেন। আরো একটি ব্যর্থ বিশ্বকাপ হয়তো রোনালদোর দুই দশকেরও বেশি সময়ের অসাধারণ ক্যারিয়ারকে কিছুটা হলেও ম্লান করবে।


তবু তিনি শুধু পর্তুগালের নয়, বিশ্ব ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম প্রভাবশালী ও সফল ফুটবলার হিসেবে স্মরণীয় হয়ে থাকবেন। তাঁর নেতৃত্ব, পরিশ্রম, জয়ের মানসিকতা এবং অসংখ্য রেকর্ড আগামী প্রজন্মের জন্য অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে।


বিশ্বকাপের মঞ্চে রোনালদোর অধ্যায় শেষ হলেও তাঁর রেখে যাওয়া উত্তরাধিকার অমলিন। এখন পর্তুগালের সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ—এই অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে নতুন প্রজন্মকে সঙ্গে নিয়ে আগামী দিনের দল গড়ে তোলা। এক যুগের সমাপ্তির পর শুরু হলো নতুন এক অধ্যায়।


বিদায়, কিংবদন্তি। আপনার বিশ্বকাপের স্বপ্ন অপূর্ণ রয়ে গেল, কিন্তু ফুটবল ইতিহাসে আপনার নাম চিরকাল উজ্জ্বল হয়ে থাকবে।