স্পোর্টস ডেস্ক। ক্রাইম ক্রনিকল 


দূর থেকে নেওয়া একটি ফ্রি-কিক। প্রথমে মনে হয় বলটি গোলপোস্টের বাইরে চলে যাবে। কিন্তু মুহূর্তের মধ্যে বলটি দিক বদলে বাঁক নিয়ে জড়িয়ে যায় জালে। ফুটবলের এমন দৃশ্য অসংখ্যবার দেখা গেছে। দর্শকদের কাছে এটি যেন জাদু, কিন্তু এর পেছনে রয়েছে পদার্থবিজ্ঞানের একটি সুপরিচিত নীতি—ম্যাগনাস ইফেক্ট (Magnus Effect)।


১৮৫২ সালে জার্মান পদার্থবিদ হাইনরিখ গুস্তাভ ম্যাগনাস এই ঘটনাটির বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা দেন। তিনি দেখান, কোনো গোলাকার বস্তু বাতাসের মধ্যে চলার পাশাপাশি ঘূর্ণন (স্পিন) করলে তার চারপাশে বায়ুর প্রবাহ সমান থাকে না। এর ফলে বলের দুই পাশে ভিন্ন ভিন্ন বায়ুচাপ তৈরি হয় এবং সেই চাপের পার্থক্য বলটিকে একদিকে বাঁকিয়ে দেয়।


ধরা যাক, একজন খেলোয়াড় বলটিকে এমনভাবে শট নিলেন যাতে বলটি সামনের দিকে এগোনোর পাশাপাশি ডানদিকে ঘুরতে থাকে। বলের এক পাশে ঘূর্ণনের দিক ও বায়ুপ্রবাহ একই হওয়ায় সেখানে বায়ুর গতি বেড়ে যায়। অন্য পাশে ঘূর্ণন বায়ুপ্রবাহের বিপরীতে হওয়ায় বায়ুর গতি কমে যায়।




বার্নৌলির নীতি (Bernoulli's Principle) অনুযায়ী, যেখানে বায়ুর গতি বেশি সেখানে বায়ুচাপ কম এবং যেখানে গতি কম সেখানে বায়ুচাপ বেশি থাকে। এই চাপের পার্থক্যই বলের ওপর একটি পার্শ্ববল (Side Force) সৃষ্টি করে, যা বলের গতিপথকে বাঁকিয়ে দেয়। এই ঘটনাকেই বলা হয় ম্যাগনাস ইফেক্ট।


ফুটবলে বিখ্যাত ‘কার্ভ শট’ বা ‘ব্যানানা শট’-এর পেছনে মূলত এই বৈজ্ঞানিক নীতিই কাজ করে। বিশ্বের অনেক কিংবদন্তি ফুটবলার—ডেভিড বেকহ্যাম, রবার্তো কার্লোস, লিওনেল মেসি ও ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো—তাদের নিখুঁত বাঁকানো ফ্রি-কিকের মাধ্যমে এই নীতির বাস্তব প্রয়োগ দেখিয়েছেন।


বিশেষ করে ১৯৯৭ সালে ফ্রান্সের বিপক্ষে রবার্তো কার্লোসের নেওয়া ফ্রি-কিকটি ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম আলোচিত উদাহরণ। প্রথমে গোলপোস্টের বাইরে যাচ্ছে বলে মনে হলেও শেষ মুহূর্তে বলটি তীব্রভাবে বাঁক নিয়ে জালে প্রবেশ করে। পরে বিজ্ঞানীরাও এই শট বিশ্লেষণ করে দেখান, এর পেছনে ম্যাগনাস ইফেক্ট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল।


তবে বল কতটা বাঁক নেবে, তা শুধু স্পিনের ওপর নির্ভর করে না। বলের ঘূর্ণনের গতি, শটের বেগ, বলের আকার ও পৃষ্ঠের গঠন, এমনকি বাতাসের ঘনত্বও এতে প্রভাব ফেলে। সাধারণভাবে স্পিন যত বেশি হবে, বলের বাঁকও তত বেশি হবে। তবে খুব বেশি গতি বা অনিয়মিত বায়ুপ্রবাহের কারণে কখনো কখনো বলের গতিপথ ভিন্ন রকমও হতে পারে।


ফুটবলে শুধু ডান বা বাঁ দিকে নয়, খেলোয়াড়রা স্পিনের মাধ্যমে বলকে ওপরের দিকে উঠিয়ে আবার নিচেও নামাতে পারেন। ফলে একটি নিখুঁত ফ্রি-কিক কেবল খেলোয়াড়ের দক্ষতার ফল নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে পদার্থবিজ্ঞানের সূক্ষ্ম নিয়মও।


তাই পরেরবার কোনো ফ্রি-কিক বাঁক নিয়ে গোলপোস্টের কোণে জড়িয়ে গেলে সেটিকে শুধু ‘জাদু’ না ভেবে মনে রাখা যায়—এটি আসলে বিজ্ঞান ও দক্ষতার অসাধারণ এক সমন্বয়।