স্পোর্টস ডেস্ক। ক্রাইম ক্রনিকল 


চারটি বিশ্বকাপ, অসংখ্য স্মরণীয় ম্যাচ, অগণিত নিখুঁত পাস আর একটি ছোট দেশের স্বপ্নকে কাঁধে তুলে নেওয়ার দীর্ঘ দুই দশকের যাত্রা। ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের শেষ ৩২-এ পর্তুগালের কাছে ২-১ গোলে হেরে বিদায় নিয়েছে ক্রোয়েশিয়া। সেই সঙ্গে শেষ হয়েছে দেশটির সর্বকালের অন্যতম সেরা ফুটবলার লুকা মদরিচের বিশ্বকাপ অধ্যায়।




প্রায় ৪১ বছর বয়সী এই কিংবদন্তি মিডফিল্ডার ২০০৬ সালে জাতীয় দলের হয়ে অভিষেকের পর থেকে ক্রোয়েশিয়াকে প্রতিটি বড় আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে নেতৃত্ব দিয়েছেন। চারটি বিশ্বকাপ ও একাধিক ইউরো চ্যাম্পিয়নশিপে দলের প্রাণভোমরা ছিলেন তিনি। ২০২৬ বিশ্বকাপই হয়ে থাকল তার শেষ বিশ্বকাপ।


মদরিচের গল্প শুধু একজন সফল ফুটবলারের নয়, বরং প্রতিকূলতাকে জয় করে উঠে আসা এক অনন্য জীবনসংগ্রামের ইতিহাস।


১৯৮৫ সালের ৯ সেপ্টেম্বর ক্রোয়েশিয়ার মোদরিচি গ্রামে জন্ম নেওয়া লুকা মদরিচের শৈশব কেটেছে ক্রোয়েশিয়ার স্বাধীনতা যুদ্ধের বিভীষিকার মধ্যে। যুদ্ধের সময় পরিবারের বাড়িঘর ছেড়ে শরণার্থী হোটেলে আশ্রয় নিতে হয়। সেই হোটেলের পার্কিং এলাকায় ফুটবল খেলেই বড় হতে থাকেন ছোট্ট লুকা। যুদ্ধ তার কাছ থেকে নিরাপদ শৈশব কেড়ে নিয়েছিল, কিন্তু ফুটবলের স্বপ্ন কেড়ে নিতে পারেনি।


পরে দিনামো জাগরেব হয়ে ইউরোপীয় ফুটবলে নিজের প্রতিভার জানান দেন তিনি। ২০০৮ সালে ইংলিশ ক্লাব টটেনহ্যাম হটস্পারে যোগ দিয়ে ইউরোপের অন্যতম সেরা মিডফিল্ডার হিসেবে পরিচিতি পান। ২০১২ সালে রিয়াল মাদ্রিদে যোগ দেওয়ার পর শুরু হয় তার ক্যারিয়ারের সোনালি অধ্যায়।


রিয়ালের জার্সিতে তিনি জিতেছেন একাধিক লা লিগা, কোপা দেল রে ও রেকর্ডসংখ্যক ছয়টি উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগ শিরোপা। ক্লাবটির ইতিহাসের অন্যতম সফল মিডফিল্ডার হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন তিনি।


তবে ক্লাব ফুটবলের সাফল্যের চেয়েও জাতীয় দলের জার্সিতেই মদরিচের অবদান তাকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে।


২০১৮ সালের রাশিয়া বিশ্বকাপে অধিনায়ক হিসেবে ক্রোয়েশিয়াকে ইতিহাসের প্রথম বিশ্বকাপ ফাইনালে তুলেছিলেন তিনি। যদিও ফাইনালে ফ্রান্সের কাছে হেরে রানার্সআপ হয় দলটি, পুরো আসরে অসাধারণ নৈপুণ্যের স্বীকৃতি হিসেবে মদরিচ জেতেন গোল্ডেন বল। একই বছর প্রায় এক দশক ধরে চলে আসা লিওনেল মেসি ও ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর ব্যালন ডি'অর আধিপত্য ভেঙে বিশ্বের সেরা ফুটবলারের পুরস্কার জিতে নেন তিনি।


এরপর ২০২২ কাতার বিশ্বকাপেও বয়সকে হার মানিয়ে ক্রোয়েশিয়াকে তৃতীয় স্থান এনে দেন। ২০২৩ সালে দলকে তুলেছিলেন উয়েফা নেশনস লিগের ফাইনালেও।


সংখ্যার দিক থেকেও মদরিচ ক্রোয়েশিয়ার ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা। জাতীয় দলের হয়ে ২০১টি ম্যাচ খেলে দেশের সর্বোচ্চ আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলার রেকর্ড গড়েছেন। করেছেন ২৯টি গোল, যা তাকে দেশের সর্বকালের অন্যতম সেরা গোলদাতাদের তালিকায় স্থান দিয়েছে।




তবে মদরিচকে কেবল পরিসংখ্যান দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। মাঝমাঠে খেলার গতি নিয়ন্ত্রণ, চাপের মুহূর্তে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া, আক্রমণের সূচনা করা এবং সতীর্থদের জন্য সুযোগ তৈরি—এসব গুণই তাকে ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা মিডফিল্ডারে পরিণত করেছে। শক্তি কিংবা গতির চেয়ে বুদ্ধিমত্তা, দৃষ্টিভঙ্গি ও নিখুঁত পাসিং দিয়েই তিনি ম্যাচের চিত্র বদলে দিতেন।


২০২৬ বিশ্বকাপেও দলের অন্যতম নির্ভরযোগ্য খেলোয়াড় ছিলেন মদরিচ। কিন্তু শেষ ৩২-এ পর্তুগালের কাছে ২-১ গোলের পরাজয়ের পর শেষবারের মতো বিশ্বকাপের মঞ্চ থেকে বিদায় নেন তিনি।


শেষ বাঁশি বাজার পর যখন পর্তুগালের খেলোয়াড়েরা বিজয় উদ্‌যাপনে ব্যস্ত, তখন মদরিচকে কিছুক্ষণ একা দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায় মাঠের মাঝখানে। যেন দুই দশকের স্মৃতি, সাফল্য আর অপূর্ণ স্বপ্নকে নীরবে বিদায় জানাচ্ছিলেন ফুটবলের এই শিল্পী।


লুকা মদরিচ হয়তো বিশ্বকাপ জিততে পারেননি। কিন্তু তিনি একটি ছোট দেশকে বিশ্ব ফুটবলের পরাশক্তিদের কাতারে নিয়ে গেছেন। প্রমাণ করেছেন, প্রতিভা, পরিশ্রম, নেতৃত্ব ও বিনয় একসঙ্গে থাকলে অসম্ভবও সম্ভব।


কিছু ফুটবলার স্মরণীয় হয়ে থাকেন জেতা ট্রফির জন্য। আর কিছু ফুটবলার ইতিহাসে বেঁচে থাকেন, কারণ তারা ফুটবলকে আরও সুন্দর করে তুলেছিলেন।


লুকা মদরিচ নিঃসন্দেহে সেই দ্বিতীয় শ্রেণির কিংবদন্তিদের একজন।