নিজস্ব প্রতিবেদক | ক্রাইম ক্রনিকল


বরিশাল মহানগর ছাত্রশিবিরের এক নেতার বিরুদ্ধে সংগঠনেরই আরেক নেতাকে হত্যার হুমকি দেওয়ার অভিযোগকে কেন্দ্র করে সংগঠনটির ভেতরে নতুন বিতর্ক তৈরি হয়েছে। ঘটনার পর প্রথমে অভিযুক্ত নেতার বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়ার ইঙ্গিত দেওয়া হলেও শেষ পর্যন্ত হুমকির শিকার দাবি করা বরিশাল পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট শাখার সভাপতি মো. আবু নাসেরের দায়িত্ব স্থগিত এবং সাথীপদ বাতিল করা হয়েছে। পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দীর্ঘ বক্তব্য দিয়ে তিনি সাংগঠনিক নেতৃত্বের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ তোলেন এবং ন্যায়বিচার না পেলে আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার ঘোষণা দেন।


ঘটনার সূত্রপাত গত ১ জুলাই। সংগঠন-সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানায়, বরিশাল পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট শাখার ষাণ্মাসিক প্রতিবেদন সময়মতো জমা না দেওয়াকে কেন্দ্র করে বরিশাল মহানগর ছাত্রশিবিরের সাহিত্য সম্পাদক শাহেদ খানের সঙ্গে সভাপতি আবু নাসেরের বাক্‌বিতণ্ডা হয়। এ সময় ফোনালাপে শাহেদ খান আবু নাসেরকে বরিশালে না আসতে বলেন। জবাবে আবু নাসের জানতে চান, তিনি বরিশাল ‘লিজ’ নিয়েছেন কি না।


এরপর কথোপকথন উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। অভিযোগ অনুযায়ী, শাহেদ খান আবু নাসেরকে উদ্দেশ করে বলেন, ‘তোরে তুড়ি মাইরা উড়াইয়া দিমু’ এবং ‘তোরে তেলাপোকার মতো পিষে মাইরা ফালামু।’ পাশাপাশি তাকে ‘পাগলের বাচ্চা’ বলেও গালি দেওয়া হয়। ওই ফোনালাপের একটি অডিও রেকর্ড সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন গণমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।



বা দিক থেকে - ভুক্তভোগী আবু নাসের ও অভিযুক্ত শাহেদ খান। ছবি: সংগৃহীত 


এ বিষয়ে শাহেদ খান বলেন, আবু নাসের তার ‘খুব কাছের ছোট ভাই’। রাগের মাথায় এমন কথা বলে ফেলেছেন উল্লেখ করে তিনি দাবি করেন, বিষয়টি তারা নিজেদের মধ্যে সমাধানের চেষ্টা করছেন এবং এটি অভ্যন্তরীণ বিষয়।


ঘটনার পর বরিশাল মহানগর ছাত্রশিবিরের সভাপতি আতিকুল ইসলাম বলেন, এ ধরনের ভাষা সংগঠনের নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তিনি জানান, সাহিত্য সম্পাদককে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেওয়া হবে এবং প্রাথমিকভাবে তার সদস্যপদ স্থগিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।


তবে পরদিন পরিস্থিতি ভিন্ন মোড় নেয়। মহানগর সভাপতির স্বাক্ষরিত এক নোটিশে জানানো হয়, দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালনে নিষ্ক্রিয় থাকার অভিযোগে বরিশাল পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট শাখার সভাপতি আবু নাসেরের দায়িত্ব স্থগিত করা হয়েছে এবং তার সাথীপদও বাতিল করা হয়েছে। নোটিশে তার বিরুদ্ধে সাংগঠনিক শৃঙ্খলা ভঙ্গ ও দীর্ঘদিন নিষ্ক্রিয় থাকার অভিযোগ আনা হয়।


এই সিদ্ধান্তের পর ফেসবুকে দীর্ঘ এক পোস্টে নিজের অবস্থান তুলে ধরেন আবু নাসের। সেখানে তিনি দাবি করেন, সংগঠনের স্বার্থে ক্যারিয়ারের সুযোগ ছেড়ে বরিশালে থেকে দায়িত্ব পালন করেছেন। পারিবারিক আর্থিক সংকট, মায়ের অস্ত্রোপচার এবং নিজের দুর্দশার কথাও উল্লেখ করেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, সংগঠনের দায়িত্বে থেকে তিনি একসময় টানা তিন দিন একবেলা ভাত ও বাকি সময় মুড়ি খেয়ে কাটিয়েছেন।


আবু নাসের আরও অভিযোগ করেন, সাংগঠনিক দায়িত্ব পালনের সময় তাকে আর্থিক সহায়তার আশ্বাস দেওয়া হলেও তা বাস্তবায়ন হয়নি। সম্প্রতি বাড়িতে অবস্থান করেও তিনি সাংগঠনিক কার্যক্রমে যুক্ত ছিলেন। একটি অনলাইন কুইজের পুরস্কার হিসেবে কোরআন শরিফ সংগ্রহের বিষয়ে যোগাযোগ করতেই তার বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করা হয় এবং পরে শাহেদ খান ফোন করে তাকে অশালীন ভাষায় গালিগালাজ ও প্রাণনাশের হুমকি দেন।


ফেসবুক পোস্টে তিনি দাবি করেন, পুরো ফোনালাপ তার মোবাইলে রেকর্ড রয়েছে। তিনি আরও অভিযোগ করেন, মহানগর নেতৃত্বের কাছে বিচার পাওয়ার আশা না থাকায় বিষয়টি প্রকাশ্যে আনতে বাধ্য হয়েছেন।


আবু নাসেরের ভাষ্য, অভিযুক্ত নেতার বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা না নেওয়া হলে তিনি শাহেদ খানের বিরুদ্ধে হত্যাচেষ্টার অভিযোগে মামলা করবেন। একই সঙ্গে সংগঠনের আরও কয়েকজন সাবেক ও বর্তমান দায়িত্বশীলের বিরুদ্ধেও প্রতারণার অভিযোগে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার ইঙ্গিত দেন।


আবু নাসের দিনাজপুরের খানসামা উপজেলার গোয়ালডিহি গ্রামের বাসিন্দা। তার বাবা মাওলানা আতাউর রহমান স্থানীয় জামায়াতের সাবেক আমির। তার ভাই মুজাহিদুল ইসলাম ২০১২ সালে পুলিশের গুলিতে নিহত হন। ছাত্রশিবির তাকে সংগঠনের ‘১৪১তম শহীদ’ হিসেবে প্রতিবছর স্মরণ করে।


ঘটনাটি নিয়ে সংগঠনের ভেতরে ও বাইরে আলোচনা-সমালোচনা চলছে। তবে এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত অভিযুক্ত শাহেদ খানের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিকভাবে কী সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, সে বিষয়ে সংগঠনের পক্ষ থেকে নতুন কোনো ঘোষণা পাওয়া যায়নি।