স্পোর্টস ডেস্ক | ক্রাইম ক্রনিকল বিশেষ প্রতিবেদন


১৮ ডিসেম্বর ২০২২। কাতারের লুসাইল স্টেডিয়ামে যখন লিওনেল মেসি সোনালি বিশ্বকাপ ট্রফিটি আকাশের দিকে তুলে ধরছিলেন, তখন কোটি কোটি ফুটবলপ্রেমী এক ঐতিহাসিক মুহূর্তের সাক্ষী হচ্ছিলেন। কেউ দেখছিলেন একজন কিংবদন্তির স্বপ্নপূরণ, আবার কেউ খুঁজছিলেন বিতর্কের খোরাক।


বিশ্বকাপ শেষ হওয়ার পর থেকেই একটি প্রশ্ন বারবার ফিরে এসেছে—

“মেসিকে বিশ্বকাপ জেতানোর জন্য কি ফিফা বিশেষ সুবিধা দিয়েছিল?”


এই বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল আর্জেন্টিনার পাওয়া একাধিক পেনাল্টি এবং মেসির চারটি পেনাল্টি গোল।

কিন্তু তথ্য, পরিসংখ্যান এবং ম্যাচের বাস্তব চিত্র কী বলে?


বিতর্কের শুরু কোথায়?


২০২২ বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা সাত ম্যাচে মোট পাঁচটি পেনাল্টি পেয়েছিল। বিশ্বকাপের ইতিহাসে এটি একটি উল্লেখযোগ্য সংখ্যা।


আর ঠিক এখান থেকেই শুরু হয় আলোচনা।


সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকেই দাবি করেন, রেফারির সিদ্ধান্তগুলো বারবার আর্জেন্টিনার পক্ষে গেছে। কেউ কেউ আরও একধাপ এগিয়ে বলেন, ফুটবলের সবচেয়ে বড় পুরস্কারটি মেসির হাতে তুলে দেওয়ার জন্যই এসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল।


কিন্তু অভিযোগ আর বাস্তবতা কি একই জিনিস?


ম্যাচে ম্যাচে মেসি: পেনাল্টি নাকি পারফরম্যান্স?


প্রথম ম্যাচ: সৌদি আরবের ধাক্কা


বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচেই মেসি পেনাল্টি থেকে গোল করেন।

মনে হচ্ছিল আর্জেন্টিনা সহজ জয় পেতে যাচ্ছে।

কিন্তু দ্বিতীয়ার্ধে সৌদি আরব ইতিহাস গড়ে। দুই গোল করে তারা ম্যাচ জিতে নেয় ২-১ ব্যবধানে।




এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট—

যদি সত্যিই পেনাল্টিই সবকিছু নির্ধারণ করত, তাহলে আর্জেন্টিনা এই ম্যাচ কি হারত?


মেক্সিকোর বিপক্ষে ‘বাঁচা-মরার’ ম্যাচ


সৌদি আরবের কাছে হারার পর আর্জেন্টিনার সামনে ছিল বিদায়ের শঙ্কা।

ঠিক তখনই মেসি এগিয়ে আসেন।

দূরপাল্লার দুর্দান্ত এক শটে গোল করেন এবং পরে আরেকটি গোল তৈরিতেও ভূমিকা রাখেন।




এ ম্যাচে কোনো পেনাল্টি ছিল না।

তবুও মেসিই ছিলেন পার্থক্য গড়ে দেওয়া খেলোয়াড়।


পোল্যান্ড ম্যাচ: পেনাল্টি মিস, তবুও জয়


গ্রুপপর্বের শেষ ম্যাচে মেসি একটি পেনাল্টি পান।

কিন্তু গোলরক্ষক তা ঠেকিয়ে দেন।

তবুও আর্জেন্টিনা ম্যাচ জেতে ২-০ ব্যবধানে।




অর্থাৎ এখানে পেনাল্টি না পেলেও কিংবা গোল না হলেও ফলাফল একই থাকত।


অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে নকআউট লড়াই


শেষ ষোলোর ম্যাচে মেসি করেন অসাধারণ একটি ওপেন-প্লে গোল।

কোনো পেনাল্টি নয়।

কোনো বিতর্ক নয়।




শুধু একজন বিশ্বমানের ফুটবলারের মুহূর্ত।

আর্জেন্টিনা জিতে যায় ২-১ ব্যবধানে।


নেদারল্যান্ডস ম্যাচ: বিতর্কের প্রথম বড় অধ্যায়


কোয়ার্টার ফাইনালে মেসি প্রথমে এক জাদুকরী পাসে গোল বানিয়ে দেন।

পরে পেনাল্টি থেকে করেন আরেকটি গোল।

আর্জেন্টিনা এগিয়ে যায় ২-০ ব্যবধানে।




কিন্তু ম্যাচ তখনও শেষ হয়নি।

নেদারল্যান্ডস শেষ মুহূর্তে দুই গোল করে সমতায় ফেরে।

ম্যাচ গড়ায় টাইব্রেকারে।


এখানে প্রশ্ন হলো—

যদি রেফারি শুধু আর্জেন্টিনাকে জেতাতে চাইতেন, তাহলে ম্যাচ কেন টাইব্রেকার পর্যন্ত গড়াল?


ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে সেমিফাইনাল


এবার বিতর্কের সবচেয়ে শক্তিশালী যুক্তি পাওয়া যায়।

কারণ ম্যাচের প্রথম গোলটি আসে পেনাল্টি থেকে।

এই গোলের পরই ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি আর্জেন্টিনার হাতে চলে যায়।




ক্রোয়েশিয়া আক্রমণে উঠে আসতে বাধ্য হয় এবং সেই সুযোগে আর্জেন্টিনা আরও দুটি গোল করে।


এখানে স্বীকার করতেই হবে—

এই পেনাল্টি ম্যাচের গতিপথ বদলাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল।


ফাইনাল: মেসি বনাম এমবাপ্পে


বিশ্বকাপ ইতিহাসের অন্যতম সেরা ফাইনাল।

২৩ মিনিটে পেনাল্টি থেকে গোল করেন মেসি।

পরে দি মারিয়ার গোলে আর্জেন্টিনা এগিয়ে যায় ২-০ ব্যবধানে।


সবকিছু যখন শেষ হয়ে গেছে বলে মনে হচ্ছিল, তখন আবির্ভাব ঘটে কিলিয়ান এমবাপ্পের।

মাত্র কয়েক মিনিটের ব্যবধানে দুটি গোল।

একটি পেনাল্টি থেকে এবং একটি এম্বাপ্পের অসাধারণ ভলি গোল।


হ্যাঁ, ফ্রান্সও সেই ম্যাচে দুটি পেনাল্টি পেয়েছিল।


অতিরিক্ত সময়ে আবার গোল করেন মেসি।

ওপেন প্লে থেকে।




আবার সমতা ফেরান এমবাপ্পে। সেই পেনাল্টি থেকেই করেন কামব্যাক গোল।


শেষ পর্যন্ত বিশ্বকাপের ভাগ্য নির্ধারিত হয় টাইব্রেকারে।

সেখানে নায়ক হয়ে ওঠেন গোলরক্ষক এমিলিয়ানো মার্টিনেজ।


তাহলে পেনাল্টির ভূমিকা কতটা?


মেসির মোট গোল: ৭টি


এর মধ্যে পেনাল্টি থেকে: ৪টি

ওপেন প্লে থেকে: ৩টি

এছাড়া অ্যাসিস্ট: ৩টি


অর্থাৎ পেনাল্টি বাদ দিলেও মেসির বিশ্বকাপ পরিসংখ্যান দাঁড়ায়—

✔️ ৩ গোল

✔️ ৩ অ্যাসিস্ট

✔️ ৬টি সরাসরি গোল অবদান


যা এখনো একটি অসাধারণ বিশ্বকাপ পারফরম্যান্স।


তাহলে আসল সত্যটা কী?


তথ্য বলছে—

- সৌদি আরবের বিপক্ষে পেনাল্টি আর্জেন্টিনাকে জেতাতে পারেনি।

- পোল্যান্ডের বিপক্ষে পেনাল্টি মিস করেও আর্জেন্টিনা জিতেছে।

- নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে পেনাল্টি গুরুত্বপূর্ণ ছিল, কিন্তু ম্যাচের নিষ্পত্তি হয়েছে টাইব্রেকারে।

- ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে পেনাল্টি ম্যাচের মোড় ঘুরিয়েছে।

- ফাইনালে মেসির পেনাল্টি গুরুত্বপূর্ণ ছিল, কিন্তু ফ্রান্সও দুটি পেনাল্টি পেয়েছিল।


অর্থাৎ পেনাল্টিগুলো আর্জেন্টিনাকে সুবিধা দিয়েছে—এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই।

কিন্তু বিশ্বকাপ জয়ের একমাত্র কারণ ছিল পেনাল্টি—এমন দাবির পক্ষেও কোনো শক্ত প্রমাণ নেই।


বির্তক থাকবে, ইতিহাসও থাকবে


ফুটবলে আবেগ আছে, পক্ষপাত আছে, তর্ক আছে।


মেসিকে ভালোবাসেন যারা, তারা দেখেন একজন কিংবদন্তির পরিণতি।

মেসির সমালোচকেরা দেখেন বিতর্কিত কিছু রেফারিং সিদ্ধান্ত।

কিন্তু ইতিহাস সাধারণত আবেগ দিয়ে নয়, ফলাফল দিয়ে লেখা হয়।


আর ইতিহাস বলছে—

লিওনেল মেসি ২০২২ বিশ্বকাপ জিতেছেন।

হ্যাঁ, সেই যাত্রায় পেনাল্টি ছিল।

কিন্তু ছিল জাদুকরী পাস, গুরুত্বপূর্ণ গোল, নেতৃত্ব, অসাধারণ দলগত পারফরম্যান্স এবং টাইব্রেকারের স্নায়ুযুদ্ধও।




তাই প্রশ্নটি আজও থেকে যায়—

পেনাল্টি কি মেসির হাতে বিশ্বকাপ তুলে দিয়েছিল?

নাকি বিশ্বকাপটি ছিল এমন একজন ফুটবলারের প্রাপ্য পুরস্কার, যিনি শেষ পর্যন্ত নিজের প্রতিভা দিয়েই ফুটবলের সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছেছিলেন?


সিদ্ধান্ত পাঠকের।