ক্যাম্পাস প্রতিনিধি | রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
সহিংসতা, ভয়ভীতি প্রদর্শন, অসদাচরণ ও একটি বিতর্কিত চাঁদা সংগ্রহ অভিযানসহ একাধিক অভিযোগে ক্রমেই সমালোচনার মুখে পড়ছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (রাকসু) সাধারণ সম্পাদক সালাউদ্দিন আম্মার।
সবশেষ বিতর্কের সূত্রপাত গত সোমবার বিকেলে। আম্মার ও সহকারী সাধারণ সম্পাদক সালমান সাব্বির নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের কর্মী আখ্যা দিয়ে তিন শিক্ষার্থীকে প্রক্টর অফিস ও পরে কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারে দফায় দফায় মারধর করেন বলে অভিযোগ।
ভুক্তভোগীরা হলেন ইতিহাস বিভাগের মো. আনাস ও হাসিব এবং সংস্কৃত বিভাগের মাহমুদুল হাসান। একটি ছবিতে বেলচা হাতে গ্রন্থাগারের দিকে তেড়ে যেতে দেখা যায় আম্মারকে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভিডিওতে দেখা যায়, আম্মার কোদাল হাতে এক শিক্ষার্থীকে হুমকি দিচ্ছেন এবং বাঁশের লাঠি দিয়ে মারধর করছেন। হাসপাতালে নেওয়ার পথে অ্যাম্বুলেন্স থেকে মাহমুদুলকে টেনে নামিয়ে মারধরের দৃশ্যও ধরা পড়ে।
ঘটনার কয়েক ঘণ্টা পর আহত আনাস ও মাহমুদুলকে পুলিশ হেফাজতে নেওয়া হয়। গত মাসের একটি সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মামলায় তাদের গ্রেপ্তার দেখিয়ে কারাগারে পাঠানো হয়।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এটিই আম্মারের বিরুদ্ধে প্রথম গুরুতর অভিযোগ নয় — এর আগে একটি খুনের ঘটনাতেও তার নাম জড়িয়েছিল। গত বছর সেপ্টেম্বরে সাবেক ছাত্রলীগ নেতা ও বিশ্ববিদ্যালয় কর্মচারী আবদুল্লাহ আল মাসুদ খুন হন, এবং সেই হত্যাকাণ্ডের তদন্তে আম্মারের নাম উঠে আসে।
ভুক্তভোগীকে হাসপাতালে নেওয়ার আগমুহূর্তে ঘটনাস্থলের কাছে আম্মারের উপস্থিতি ছিল কি না, তা এখনো খতিয়ে দেখছেন তদন্তকারীরা। আম্মার অবশ্য এতে জড়িত থাকার অভিযোগ অস্বীকার করেন।
তিনি দাবি করেন, রাজনৈতিক প্রতিহিংসাবশত তাকে এই হত্যাকাণ্ডে জড়ানো হয়েছে। তবে মামলাটি এখনো তদন্তাধীন এবং চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসেনি।
এই সর্বশেষ ঘটনার প্রতিবাদে এগিয়ে এসেছে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্ক। বুধবার এক বিবৃতিতে সংগঠনটি বলে, শেখ হাসিনা সরকারের আমলের ট্যাগিং ও হেনস্তার সংস্কৃতি নতুন পরিচয়ে ফিরে আসছে।
রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে শিক্ষার্থীদের ট্যাগ করে 'মব জাস্টিসের' শিকার বানানো হয়েছে বলেও অভিযোগ করে সংগঠনটি। জড়িতদের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইন ও বিশ্ববিদ্যালয়ের বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানায় তারা।
বিবৃতিতে আরও উল্লেখ করা হয় উসকানিমূলক বক্তব্য, প্রশাসনিক ভবন ঘেরাও, আওয়ামীপন্থী শিক্ষক-কর্মকর্তাদের হেনস্তা এবং উপাচার্যের কার্যালয়ে তালা ঝোলানোর ঘটনা। দেশের শীর্ষস্থানীয় দুটি সংবাদমাধ্যম প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার কার্যালয়ে হামলাতেও উসকানির অভিযোগ তোলা হয়েছে জিএস ও ভিপির বিরুদ্ধে।
শিক্ষক নেটওয়ার্কের ভাষ্য, এটি বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়, বরং উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আইনের শাসন নিয়েই গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে। অভিযোগ তদন্তের দায়িত্ব ছাত্রসংগঠনের নয়, প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর — এমনটাই মত তাদের।
বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ঘটনার রাতেই পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করে। কমিটির সদস্য অধ্যাপক গোলাম সাদিক বলেন, আম্মার তার দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করেছেন কি না তাও তদন্তে খতিয়ে দেখা হবে।
প্রক্টর মাহবুবর রহমান বলেন, ঘটনাটি বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার জন্য গুরুতর আঘাত। গ্রন্থাগারে ঢুকে এমন ঘটনা ঘটানো সম্পূর্ণ নিন্দনীয় বলে মন্তব্য করেন তিনি।
মঙ্গলবার সংবাদ সম্মেলনে রাকসুর সহসভাপতি মোস্তাকুর রহমান জাহিদ প্রতিবেদন প্রকাশের জন্য সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার হুমকি দেন। রাকসু ও শিবিরকে নেতিবাচকভাবে তুলে ধরার অভিযোগ তোলেন তিনি।
যোগাযোগ করা হলে আম্মার বলেন, আন্দোলনের সময় তিনি সবসময় নিয়ম মেনে চলার চেষ্টা করেছেন, কিন্তু প্রশাসন সহযোগিতা করে না। ছাত্রলীগ প্রতিহিংসাবশত তার বিরুদ্ধে এসব ছড়াচ্ছে বলে দাবি করেন তিনি।