স্টাফ রিপোর্টার | ক্রাইম ক্রনিকল
জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ইসলামপন্থী জোটে আবারও ভাঙনের আভাস দেখা দিয়েছে। রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ, নির্বাচনী সমঝোতা এবং আসন বণ্টন নিয়ে দীর্ঘদিনের অসন্তোষের জেরে বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন কার্যত জোট থেকে সরে গেছে বলে দলটির একাধিক নেতা দাবি করেছেন। তবে এ বিষয়ে দলটির শীর্ষ নেতৃত্বের বক্তব্যে দেখা গেছে ভিন্নতা। অন্যদিকে জামায়াতের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, খেলাফত আন্দোলন এখনো জোটের সঙ্গেই রয়েছে এবং আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো সিদ্ধান্ত তাদের জানানো হয়নি।
খেলাফত আন্দোলনের একাধিক সূত্র জানায়, জোট গঠনের পর থেকেই জামায়াতে ইসলামী এককভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রবণতা দেখিয়েছে। কর্মসূচি নির্ধারণ থেকে শুরু করে রাজনৈতিক কৌশল—বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই শরিক দলগুলোর মতামত যথাযথ গুরুত্ব পায়নি বলে অভিযোগ তাদের।
দলটির নেতারা অভিযোগ করেন, জোটের লিয়াজোঁ কমিটির বৈঠক বা আলোচনার আগেই জামায়াত অনেক সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করে ফেলত। পরে তা শরিকদের জানানো হতো। এতে জোটের অংশীদারিত্বের চেতনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে তাদের দাবি।
খেলাফত আন্দোলনের একটি সূত্র জানায়, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে দলটি জামায়াতের কাছে প্রায় ১০টি আসনে সমঝোতা বা ছাড় চেয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত একটি আসনেও সমর্থন পায়নি। বিষয়টি দলটির মধ্যে ব্যাপক অসন্তোষের জন্ম দেয় এবং সেখান থেকেই জোটে দূরত্ব বাড়তে শুরু করে।
দলটির নায়েবে আমির মাওলানা মুজিবুর রহমান হামিদী বলেন, “আমরা তো ১১ দলীয় ঐক্যে কার্যত আর নেই। জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় আমাদের সঙ্গে যে সমঝোতার কথা ছিল, তা হয়নি। আসন দেওয়ার প্রতিশ্রুতি থাকলেও শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়ন হয়নি। তখন থেকেই আমরা একপ্রকার জোটের বাইরে।”

মাওলানা মুজিবুর রহমান হামিদী
তবে জোট ছাড়ার পেছনে অন্য কোনো কারণ রয়েছে কি না—এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বিস্তারিত মন্তব্য করতে অপারগতা প্রকাশ করেন এবং বিষয়টি নিয়ে দলের আমিরের সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন।
অন্যদিকে বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের আমির মাওলানা হাবিবুল্লাহ মিয়াজী জোট ছাড়ার বিষয়টি ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করেন। তিনি বলেন, “জামায়াতের সঙ্গে আমাদের কোনো জোট বা সমঝোতাই ছিল না। তাই বের হয়ে যাওয়ার প্রশ্নও আসে না। আমরা আগে থেকেই সেখানে ছিলাম না।”
এদিকে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা রয়েছে, হেফাজতপন্থী কয়েকটি দলের সঙ্গে জামায়াতের ঘনিষ্ঠ নির্বাচনী সমন্বয়ের পর জোটের অভ্যন্তরে নতুন সমীকরণ তৈরি হয়েছে। একটি সূত্র দাবি করেছে, হেফাজত-ঘনিষ্ঠ চারটি দলের সঙ্গে জামায়াতের নির্বাচনী বোঝাপড়া জোরদার হওয়ার পর খেলাফত আন্দোলনের অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়ে। যদিও এ ধরনের চাপ বা প্রভাবের অভিযোগ সরাসরি নাকচ করেছেন মাওলানা হাবিবুল্লাহ মিয়াজী।
খেলাফত আন্দোলনের কয়েকজন নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে দাবি করেন, দলটির আমিরের সঙ্গে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের শীর্ষ নেতৃত্বের পারিবারিক সম্পর্ক রয়েছে। এ কারণে জোটের বিষয়ে বিভিন্ন মহল থেকে প্রভাব বা পরামর্শ থাকতে পারে বলে তারা মনে করেন। তবে এ অভিযোগের পক্ষে কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এর আগে ১১ দলীয় জোটের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শরিক দল ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশও জোট থেকে নিজেদের নাম প্রত্যাহার করে নেয়। দলটির অভিযোগ ছিল, আসন বণ্টন ও রাজনৈতিক সমঝোতার ক্ষেত্রে তাদের প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। নির্বাচনের আগে সেই সিদ্ধান্ত জোটের শক্তি ও ঐক্য নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছিল।
তবে জোটে কোনো সংকট বা ভাঙনের কথা মানতে নারাজ জামায়াতে ইসলামী। দলটির সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও জোটের মুখপাত্র হামিদুর রহমান আজাদ বলেন, “খেলাফত আন্দোলন এখন পর্যন্ত আমাদের সঙ্গেই আছে। তারা আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো সিদ্ধান্ত জানায়নি। আমাদের সঙ্গে তাদের নিয়মিত যোগাযোগ রয়েছে। ১১ দলীয় জোটের মধ্যে কোনো মতবিরোধ নেই।”
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচনকে সামনে রেখে ইসলামপন্থী দলগুলোর মধ্যে আসন সমঝোতা, নেতৃত্বের প্রশ্ন এবং কৌশলগত অবস্থান নিয়ে যে টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে, খেলাফত আন্দোলনের অবস্থান সেই বাস্তবতারই প্রতিফলন। তবে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা ছাড়া জোটের ভবিষ্যৎ নিয়ে চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যাচ্ছে না।
এখন নজর থাকবে, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন আনুষ্ঠানিকভাবে নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করে কি না এবং জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট আগামী দিনে এই সংকট কাটিয়ে ঐক্য ধরে রাখতে পারে কি না।