নিজস্ব প্রতিবেদক | ক্রাইম ক্রনিকল

লেখা: শোয়েব বিন আজিজ


১৮৫৭ সালের সিপাহি বিদ্রোহের পরাজয় দক্ষিণ এশিয়ার মুসলমানদের সামনে নিজেদের সামাজিক ও রাজনৈতিক পতনের কারণ নিয়ে গভীর আত্মজিজ্ঞাসার জন্ম দেয়।


​মুঘল শাসনের অবসান ও ঔপনিবেশিক শাসনের স্থায়িত্বের মুখে একদল আলেম দাবি করেন যে --- সামরিক নয়, এ হলো ঈমান ও আমলের স্খলন, ইসলামের তথাকথিত 'বিশুদ্ধ' রূপ থেকে সরে গিয়ে লোকায়ত কুসংস্কার ও বৈধর্ম্যের অলিগলিতে মুসলমানদের বিভ্রান্ত হওয়ার খেসারত।


​স্যার সৈয়দ আহমদ খান পাশ্চাত্য শিক্ষা ও বিজ্ঞানের মাধ্যমে খাপ খাওয়ানোর কথা বললেও, ধর্ম সংস্কারকেরা রাষ্ট্রক্ষমতা পুনরুদ্ধারের আগে সমাজকে 'বিশুদ্ধ' করার ডাক দেন।


​এই চিন্তা থেকেই উনিশ ও বিশ শতকে ধর্মীয় জীবনকে লোকায়ত প্রথা ও কুসংস্কারমুক্ত করে 'বিশুদ্ধ/সহী ইসলামে' ফিরিয়ে নেওয়ার একাধিক সংস্কারবাদী আন্দোলন গড়ে ওঠে।


​হাজী শরীয়তউল্লাহর ফরায়েজি আন্দোলন ফরজ ইবাদতের পাশাপাশি বাংলার গ্রামীণ কৃষকদের জমিদারি ও নীলকরদের শোষণের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলে।


​১৮৬৬ সালে প্রতিষ্ঠিত দেওবন্দ মাদ্রাসা এমন শাস্ত্রীয় আলেম সমাজ তৈরি করতে চায়, যারা সুফি ঐতিহ্য মানলেও মাজারকেন্দ্রিক লোকপ্রথাকে 'বিদআত' বলে প্রত্যাখ্যান করে।


​এর বিপরীতে আহমদ রেজা খানের বেরেলভি ধারা নবীপ্রেম, আওলিয়াদের প্রতি শ্রদ্ধা ও সুফি ঐতিহ্যের লোকায়ত দিকগুলোকে ইসলামের আবশ্যিক অঙ্গ হিসেবে প্রতিরক্ষা করে।


​আহলে হাদিস ধারা মাযহাব অনুসরণের বিরোধিতা করে কোরআন ও সহিহ হাদিসের আক্ষরিক প্রয়োগে জোর দিয়ে প্রচলিত সামাজিক প্রথাগুলোকে ইসলামের বাইরে বলে চিহ্নিত করে।


​বিশ শতকে তাবলিগ জামাত রাষ্ট্রক্ষমতা পরিহার করে ব্যক্তিগত ধর্মচর্চা, নামাজ ও দ্বীনি শিক্ষার দাওয়াতি অনুশীলনে জোর দেয়।


​অন্যদিকে আবুল আ'লা মওদুদীর জামায়াতে ইসলামী ইসলামকে কেবল ব্যক্তিগত ধর্ম নয়, বরংচ রাষ্ট্রক্ষমতাভিত্তিক পূর্ণাঙ্গ রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক ব্যবস্থা হিসেবে ব্যাখ্যা করে। তাদের মতে, ইসলামের পূর্ণ বাস্তবায়নের জন্য রাষ্ট্রক্ষমতাও গুরুত্বপূর্ণ। ফলে অন্যান্য অনেক সংস্কারবাদী ধারার তুলনায় জামায়াতে ইসলামীর রাজনৈতিক চরিত্র অনেক বেশি সুস্পষ্ট।


​লক্ষ্য ও কৌশলে ভিন্নতা থাকলেও প্রতিটা সংস্কার আন্দোলনের মূল তাগিদ ছিল স্থানীয় সামাজিক প্রথা ও যৌথ সংস্কৃতি ছেঁটে একরৈখিক 'বিশুদ্ধ ইসলাম' তৈরি করা।


​ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রযন্ত্রে আইন বানানোর সুযোগ না থাকায় এই আন্দোলনগুলো শিক্ষা, ওয়াজ-মাহফিল, ফতোয়া এবং লিথোপ্রেসের ছাপা বইপত্রকে প্রচারের প্রধান হাতিয়ার বানায়।


​ছাপাখানার সহজলভ্যতা ধর্মীয় জ্ঞানকে আলেমদের আরবি-ফারসি বা রূপক বলয় থেকে বের করে সাধারণ মানুষের হাতে পৌঁছে দেয় এবং বিতর্ককে জনপরিসরের বিষয় বানিয়ে তোলে।


​মসজিদে মাইক ব্যবহার করা যাবে কি না, বিদ্যুতের আলো জ্বালানো জায়েজ কি না, লাউডস্পিকারে আজান দেওয়া বিদআত কি না --- এসব নিয়ে ফতোয়া, পাল্টা ফতোয়া এবং দীর্ঘ বিতর্ক চলেছে। পরে দেখা গেলো, যেসব প্রযুক্তিকে একসময় সন্দেহের চোখে দেখা হইছিলো, সেগুলোই ধর্মীয় প্রচারের সবচেয়ে কার্যকর মাধ্যম হয়ে উঠেছে।


​নিজের জীবন সংশোধনের মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া এই 'বিশুদ্ধতার' তাগিদ সময়ের সাথে অন্য মুসলমানের ঈমান ও আমলকে পরীক্ষা করার এক কঠোর মানদণ্ডে পরিণত হয়।


​শত শত বছরের সুফি মনন, যৌথ গ্রামীণ সহাবস্থান ও লোকায়ত চর্চাকে 'শিরক' বা 'বিচ্যুতি' হিসেবে চিহ্নিত করায় সমাজে বহুত্ববাদের জায়গা সংকুচিত হয়ে আসে।


​ভিন্নমতকে বুদ্ধিবৃত্তিক সহাবস্থানের চোখে না দেখে একে অপরের ওপর নৈতিক শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের প্রবণতা সুফি ও আলেম ধারাগুলোর মাঝে স্থায়ী ধর্মীয় শাস্ত্রার্থের জন্ম দেয়।


​সংস্কারবাদী এই ঐতিহ্যগুলোকে সরাসরি আজকের উগ্রবাদের জনক বলা ভুল হলেও, 'একটাই মাত্র খাঁটি ব্যাখ্যা' --- এই বৌদ্ধিক কাঠামোটা কট্টরতার উর্বর জমিন তৈরি করে।


​বিশ শতকের শেষে আফগান যুদ্ধ, পেট্রোডলারের আন্তর্জাতিক প্রবাহ, আঞ্চলিক ভূরাজনীতি ও রাষ্ট্রের ব্যর্থতার সাথে এই একমাত্রিক পাঠ যুক্ত হয়ে সহিংসতার রূপ নেয়।


​সমাজকে জোরপূর্বক নিজের ছাঁচে রূপান্তর করার এই প্রবণতা থেকে পরবর্তীতে শিয়া, আহমদিয়া, সুফি ও অন্য ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর নিপীড়নের তাত্ত্বিক ভিত্তি তৈরি করা হয়।


​ধর্মের স্বতঃস্ফূর্ত রূপান্তর বা সামাজিক আত্মসংস্কার নিজে কোনো সমস্যা না, বরঞ্চ তা সমাজেরই এক স্বাভাবিক ও ঐতিহাসিক বিকাশ।


​বিপর্যয় ঘটে তখনই, যখন একটা বহুমাত্রিক ধর্মীয় ঐতিহ্যের নানাবিধ প্রকাশকে দুমড়ে-মুচড়ে একটামাত্র একবচনে নামিয়ে এনে অন্য সব চর্চাকে বেআইনি ঘোষণা করা হয়।


​দক্ষিণ এশিয়ার সমকালীন ধর্মীয় কট্টরতা হঠাৎ করে গজিয়ে ওঠে নাই। এ হলো এক দীর্ঘ ঐতিহাসিক, প্রযুক্তিগত ও রাজনৈতিক সমীকরণের ফল।


​উপমহাদেশের এই জটিল ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে, ধর্মীয় একরৈখিকতা ও বর্জনের রাজনীতি শেষ পর্যন্ত সামাজিক বৈচিত্র্য ও পারস্পরিক সহনশীলতার মূল ভিত্তিটাকেই ধসিয়ে দেয়।


লেখায় প্রকাশিত মতামত সম্পূর্ণরূপে লেখকের নিজস্ব; ক্রাইম ক্রনিকলের সম্পাদকীয় অবস্থান নয়।