• ওয়াল স্ট্রিটের প্রচলিত রীতি ভেঙে আইপিওর এক সপ্তাহ আগেই শেয়ারপ্রতি মূল্য নির্ধারণ করেছে স্পেসএক্স

• শেয়ার বিক্রির মাধ্যমে ৭৫ বিলিয়ন ডলার সংগ্রহের লক্ষ্য; এতে কোম্পানির মূল্যায়ন পৌঁছাতে পারে ১ দশমিক ৭৫ ট্রিলিয়ন ডলারে

• উচ্চ মূল্যায়ন অনুপাত নিয়ে সতর্ক অবস্থানে রয়েছেন বিশ্লেষক ও প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা


রয়টার্স রিপোর্ট অবলম্বনে 


প্রাথমিক গণপ্রস্তাব (আইপিও) নিয়ে নতুন ইতিহাস গড়ার পথে রয়েছে ইলন মাস্কের মহাকাশ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান স্পেসএক্স। প্রচলিত বাজারচর্চা থেকে সরে এসে কোম্পানিটি আইপিওর এক সপ্তাহ আগেই শেয়ারপ্রতি মূল্য ১৩৫ ডলার নির্ধারণ করেছে। এই দরে শেয়ার বিক্রি করে ৭৫ বিলিয়ন ডলার সংগ্রহের লক্ষ্য নিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। পরিকল্পনা সফল হলে স্পেসএক্সের বাজারমূল্য প্রায় ১ দশমিক ৭৫ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছাবে।



বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করতে ব্যাংক অব আমেরিকায় স্পেসএক্সের সাইনবোর্ড


কোম্পানিটি বৃহস্পতিবার বিনিয়োগকারীদের জন্য রোডশো কার্যক্রম শুরু করবে। আগামী ১১ জুন চূড়ান্ত মূল্য নির্ধারণের পর ১২ জুন প্রযুক্তিনির্ভর শেয়ারবাজার নাসডাকে লেনদেন শুরুর সম্ভাবনা রয়েছে।


তবে কেবল আকারের দিক থেকেই নয়, আইপিও পরিচালনার কৌশলেও নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে যাচ্ছে স্পেসএক্স। খুচরা বিনিয়োগকারীদের জন্য তুলনামূলক বেশি শেয়ার বরাদ্দ, দ্রুত বাজারসূচকে অন্তর্ভুক্তির উদ্যোগ এবং প্রতিষ্ঠাতার নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে বিশেষ করপোরেট কাঠামো—সব মিলিয়ে এটি প্রচলিত আইপিওর ধারা থেকে অনেকটাই ব্যতিক্রম।


একজন সম্ভাব্য বিনিয়োগকারী রয়টার্সকে বলেন, “এই আইপিওর প্রায় সবকিছুই অস্বাভাবিক। তবে এটি যদি ইতিহাসের সবচেয়ে বড় আইপিও হতে যাচ্ছে, তাহলে হয়তো সেটাই প্রত্যাশিত।”


মূল্যায়ন নিয়ে প্রশ্ন

ইলন মাস্কের জনপ্রিয়তা এবং চুক্তি থেকে বিপুল পরিমাণ ফি আয়ের সম্ভাবনার কারণে ওয়াল স্ট্রিটের বিভিন্ন বিনিয়োগ ব্যাংকের মধ্যে স্পেসএক্সের আইপিওতে যুক্ত হওয়ার প্রতিযোগিতা তৈরি হয়েছে। তবে একই সঙ্গে কোম্পানিটির উচ্চ মূল্যায়ন নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে।


একজন সম্ভাব্য বিনিয়োগকারীর মতে, অনেক বড় প্রতিষ্ঠান এমন ধারণা দিতে চাইছে যেন তারা আগেই কোম্পানিটিতে বিনিয়োগ করেছে। এর মাধ্যমে একদিকে যেমন মাস্কের প্রভাব প্রতিফলিত হচ্ছে, অন্যদিকে সেই প্রভাব আরও শক্তিশালী হচ্ছে।



বিশাল আকৃতির স্পেসএক্স বিলবোর্ড 


বর্তমানে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত মহাকাশ প্রযুক্তিভিত্তিক বড় প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা খুবই সীমিত। ফলে স্পেসএক্সের মূল্যায়ন যাচাইয়ের জন্য সুস্পষ্ট কোনো তুলনামূলক মানদণ্ডও নেই। ২০২৫ সালে কোম্পানিটির রাজস্ব ৩৩ শতাংশ বেড়ে ১৮ দশমিক ৬৭ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছালেও একই সময়ে তাদের নিট লোকসান ছিল ৪ দশমিক ৯৪ বিলিয়ন ডলার।


বৈশ্বিক মোবাইল শিল্পসংস্থা জিএসএমএর গবেষণা শাখা জিএসএমএ ইন্টেলিজেন্সের গবেষণা ও পরামর্শ বিভাগের প্রধান টিম হ্যাট বলেন, “প্রায় ৯০ গুণ রাজস্বভিত্তিক মূল্যায়ন সাধারণ মানদণ্ডে অত্যন্ত বেশি। তবে স্পেসএক্স কোনো প্রচলিত কোম্পানি নয় এবং এর সঙ্গে সরাসরি তুলনা করার মতো তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠানও নেই।”


রোডশোতে বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ

রোডশো হলো এমন একটি প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে কোনো কোম্পানি এবং তাদের আন্ডাররাইটার ব্যাংক সম্ভাব্য বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে বৈঠক করে বাজারের আগ্রহ ও মূল্যায়ন সম্পর্কে ধারণা নেয়। আইপিওর মূল্য নির্ধারণে এ প্রক্রিয়া গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।



বাবল চার্টটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বৃহত্তম আইপিওগুলোর আপেক্ষিক আকার এবং আত্মপ্রকাশের সময় তাদের আয় দেখাচ্ছে


বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে একাধিক প্রাথমিক বৈঠকের পর স্পেসএক্স প্রায় ১ দশমিক ৭৫ ট্রিলিয়ন ডলারের মূল্যায়নের ইঙ্গিত দিয়েছে। যদিও কিছু বিনিয়োগকারী মনে করেন, কোম্পানিটির মূল্যায়ন ১ দশমিক ৫ ট্রিলিয়ন ডলার বা তারও কম হওয়া উচিত।


গোল্ডম্যান স্যাকসের এক প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী রয়টার্সকে জানান, তিনি আইপিওতে শেয়ার পাওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। তবে তাকে জানানো হয়, শেয়ার বরাদ্দের বিষয়টি ছিল ‘ডেভিড সলোমন পর্যায়ের সিদ্ধান্ত’। অর্থাৎ গোল্ডম্যান স্যাকসের প্রধান নির্বাহীর অনুমোদন ছাড়া বরাদ্দ পাওয়া কঠিন ছিল। পরে তাকে কোম্পানিটি বাজারে তালিকাভুক্ত হওয়ার পর শেয়ার কেনার পরামর্শ দেওয়া হয়।


স্পেসএক্সের আইপিওর আরেকটি আলোচিত দিক হলো ব্যক্তিগত বিনিয়োগকারীদের প্রতি বিশেষ গুরুত্ব। মিজুহো, ডয়চে ব্যাংক, ইউবিএস ও বার্কলেসসহ কয়েকটি আন্তর্জাতিক ব্যাংককে নিজ নিজ দেশে উচ্চ সম্পদশালী ব্যক্তিগত বিনিয়োগকারী খুঁজে বের করার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।


এর আগে আইপিও প্রক্রিয়ায় সাধারণত ফিডেলিটি ইনভেস্টমেন্টসের মতো বড় সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান কিংবা সিটাডেলের মতো প্রভাবশালী হেজ ফান্ডগুলোর মতামতকেই বেশি গুরুত্ব দেওয়া হতো। কিন্তু এবার সেই ধারা থেকে বেরিয়ে আসার ইঙ্গিত দিচ্ছে স্পেসএক্স।


রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কোম্পানিটি আইপিওতে বিক্রির জন্য নির্ধারিত শেয়ারের প্রায় ৩০ শতাংশ পর্যন্ত ব্যক্তিগত বিনিয়োগকারীদের জন্য সংরক্ষণের বিষয়টি বিবেচনা করছে। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, এর মাধ্যমে ইলন মাস্কের বিপুলসংখ্যক অনুসারীকে বিনিয়োগে যুক্ত করার পাশাপাশি মালিকানার ভিত্তি আরও বিস্তৃত করার লক্ষ্য রয়েছে।




যুক্তরাষ্ট্রের কানেকটিকাট অঙ্গরাজ্যের ফেয়ারফিল্ডভিত্তিক বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান ডাকোটা ওয়েলথের সিনিয়র পোর্টফোলিও ম্যানেজার রবার্ট পাভলিক বলেন, “স্পেসএক্সের প্রতি আগ্রহের পেছনে ইলন মাস্কের ব্যক্তিগত ব্র্যান্ডের বড় ভূমিকা রয়েছে। অনেকের কাছে এটি কেবল বিনিয়োগ নয়, বরং একটি মর্যাদার বিষয়ও।”


তিনি আরও বলেন, “ইলন মাস্কের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার যে প্রতীকী গুরুত্ব রয়েছে, সেটিই বহু বিনিয়োগকারীর আগ্রহের অন্যতম প্রধান কারণ।”