নিজস্ব প্রতিবেদক, চট্টগ্রাম


চট্টগ্রামের ফটিকছড়িতে নিষিদ্ধঘোষিত ছাত্রলীগের সভা ও মশাল মিছিলের ঘটনায় দায়ের করা সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মামলায় চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) সাবেক মেয়র মোহাম্মদ মনজুর আলমকে আসামি করায় রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন আলোচনা শুরু হয়েছে। পুলিশ তাঁকে মামলার ৩ নম্বর আসামি করেছে। তবে তাঁর পরিবারের দাবি, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যেই তাঁকে মামলায় জড়ানো হয়েছে।


গত শুক্রবার রাতে ফটিকছড়ি থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মো. জামাল হোসেন বাদী হয়ে মামলাটি করেন। এতে ২৯ জনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি অজ্ঞাতপরিচয় আরও ৮০ থেকে ৯০ জনকে আসামি করা হয়েছে।


মামলার এজাহার অনুযায়ী, গত বৃহস্পতিবার সকালে উপজেলার রোসাঙ্গিরী ইউনিয়নের আজিমনগর এলাকায় নাজিরহাট–মাইজভান্ডার সড়কে আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা মশাল মিছিল করেন। পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে অংশগ্রহণকারীরা পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলে ঘটনাস্থল থেকে দুজনকে আটক করা হয়। পরে তাঁদের জিজ্ঞাসাবাদের ভিত্তিতে সাবেক মেয়র মনজুর আলমসহ কয়েকজনের নাম মামলায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়।


মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে, সাবেক মেয়র মোহাম্মদ মনজুর আলম ও ফটিকছড়ির সাবেক সংসদ সদস্য খাদিজাতুল আনোয়ার সনির নির্দেশনা ও তত্ত্বাবধানে ওই কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়েছিল। এছাড়া রাষ্ট্রবিরোধী ষড়যন্ত্র ও নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডের প্রস্তুতির অভিযোগও আনা হয়েছে।


তবে মামলার অভিযোগকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন মনজুর আলমের ছোট ছেলে মোহাম্মদ ফারুক আজম। তিনি বলেন, “এটি শুধুই আইনি প্রক্রিয়া, নাকি কোনো প্রভাবশালী মহলের ইশারায় সম্ভাব্য একজন শক্তিশালী প্রার্থীকে রাজনীতির মাঠ থেকে সরিয়ে দেওয়ার কৌশল—সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।”


তিনি আরও বলেন, “মশাল মিছিল যদি হয়ে থাকে, তাহলে আমার বাবা সেখানে উপস্থিত ছিলেন কি না, সেটি কি কেউ দেখেছে? আর তাঁর বয়স বিবেচনায় তিনি এমন কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার অবস্থায় আছেন কি না, সেটিও প্রশ্নসাপেক্ষ। তাহলে তাঁকে আসামি করা হলো কেন?”


সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের সম্ভাব্য নির্বাচনে মনজুর আলমের প্রার্থী হওয়ার আলোচনা কয়েক মাস ধরেই রাজনৈতিক অঙ্গনে ছিল। এ প্রেক্ষাপটে তাঁর বিরুদ্ধে মামলা রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশের অংশ কি না, তা নিয়েও আলোচনা চলছে।


এর আগে গত এপ্রিলে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতা হাসনাত আবদুল্লাহ চট্টগ্রামে মনজুর আলমের বাসভবনে সাক্ষাৎ করতে গেলে তাঁকে ঘিরে রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হয়েছিল। সে সময় স্থানীয় বিএনপি ও যুবদলের একটি অংশ তাঁর বিরুদ্ধে বিক্ষোভও করে।


অন্যদিকে পুলিশ বলছে, মামলাটি সম্পূর্ণ আইনগত প্রক্রিয়ার অংশ। ফটিকছড়ি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. রবিউল আলম বলেন, “নিষিদ্ধঘোষিত সংগঠন ছাত্রলীগের সভা ও মিছিলের ঘটনায় পুলিশ বাদী হয়ে মামলা করেছে। গ্রেপ্তার ও পলাতক আসামিদের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। পলাতক আসামিদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে।”


তবে সাবেক মেয়র মনজুর আলম ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন কি না—এ প্রশ্নের সরাসরি জবাব দেননি তিনি।


এদিকে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) চট্টগ্রাম শাখার সাধারণ সম্পাদক আখতার কবির চৌধুরী মনে করেন, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলার সংস্কৃতি এখনো বন্ধ হয়নি। তাঁর ভাষায়, “অতীতে গায়েবি ও বিতর্কিত মামলার যে সংস্কৃতি ছিল, মানুষ আশা করেছিল রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সেখান থেকে বেরিয়ে আসা যাবে। কিন্তু বাস্তবে সেই প্রত্যাশা পূরণ হয়নি।”


মামলার তদন্ত ও পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই হবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। তবে সাবেক মেয়র মনজুর আলমকে ঘিরে নতুন এই মামলা চট্টগ্রামের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।এই সংস্করণটি প্রথম আলোর বিশ্লেষণধর্মী, তথ্যভিত্তিক ও ভারসাম্যপূর্ণ প্রতিবেদনের ধাঁচে লেখা হয়েছে।