নিজস্ব প্রতিবেদক | ক্রাইম ক্রনিকল
পরিবেশবান্ধব গণপরিবহনকে উৎসাহিত করতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) বৈদ্যুতিক বাস ও ট্রাক আমদানিতে সম্পূর্ণ শুল্ক-কর অব্যাহতি ঘোষণা করেছে। তবে এই সুবিধা পেতে আমদানিকারকদের তিনটি কঠিন শর্ত পূরণ করতে হবে। সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে সময় - আগামী ৩০ জুনের পর এই সুবিধা আর নাও থাকতে পারে।
ইতিমধ্যে দেশের বড় বড় পরিবহন গ্রুপ ও আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো চীন ও ভারত থেকে নমুনা আনতে শুরু করলেও কাগজপত্রের জটিলতায় আটকে পড়ছেন অনেকে। এনবিআর সূত্র বলছে, এ পর্যন্ত মাত্র ১২টির মতো ইভি বাস ও ট্রাকের আবেদন জমা পড়েছে।
তিন শর্ত কী কী?
প্রথমত, আমদানি করা বাস বা ট্রাকটি একদম নতুন হতে হবে - রিকন্ডিশন বা পুরোনো গাড়ি এই সুবিধায় আনা যাবে না। দ্বিতীয়ত, গাড়ির ব্যাটারি প্রতিস্থাপন ছাড়া কমপক্ষে ৭ বছর বা ৩ লাখ কিলোমিটার চলার ওয়ারেন্টি থাকতে হবে, যার সপক্ষে সঠিক প্রমাণ দিতে হবে। তৃতীয়ত, গাড়িটিকে অবশ্যই বিআরটিএ বা স্বীকৃত কোনো দেশি-বিদেশি কর্তৃপক্ষের টাইপ অ্যাপ্রোভাল বা সনদপ্রাপ্ত হতে হবে। এ ছাড়া চালকসহ ন্যূনতম ১৭ আসনের বাস ও ৫ টন বা তার বেশি ক্ষমতার ট্রাক এই সুবিধার আওতায় পড়বে। এই তিন শর্তের যেকোনো একটিও পূরণ করতে ব্যর্থ হলে পুরো কর দিতে হবে।
কতটুকু কর ছাড় পাবেন?
এনবিআরের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, আমদানি শুল্ক, নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক (আরডি), সম্পূরক শুল্ক (এসডি) - এই তিন ধরনের শুল্ক থেকে সম্পূর্ণ অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ভ্যাটের আগাম কর ও অগ্রিম আয়কর (এআইটি) ও দিতে হবে না। অর্থাৎ, সাধারণ সময়ে একটি ইভি বাস আমদানিতে যে ৪০-৫০ লাখ টাকা কর দিতে হতো, এখন তা সম্পূর্ণ এড়ানো যাবে। শুধু আনুষ্ঠানিকতা ও কাগজপত্রের খরচ বহন করলেই চলবে। এতে আমদানিকারকদের জন্য বড় অঙ্কের সাশ্রয় হচ্ছে।
সুবিধা: পরিবেশের কথা বললে, ডিজেলচালিত বাসের চেয়ে ইভি বাসে কার্বন নিঃসরণ প্রায় শূন্যের কাছাকাছি, যা বায়ুদূষণ কমাতে বড় ভূমিকা রাখবে। দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি খরচ অনেক সাশ্রয়ী - প্রতি কিলোমিটারে ডিজেলের তুলনায় বিদ্যুতের খরচ ৬০-৭০ শতাংশ কম। গণপরিবহনের বহর আধুনিক ও নীরব হবে, যাত্রীরাও পাবেন আরামদায়ক পরিবহন। সরকারের ২০৪১ সালের শূন্য কার্বন নিঃসরণের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। বেসরকারি খাতকে এভাবে উৎসাহ দিলে তারা দ্রুত পুরনো বাস-ট্রাক ইভিতে রূপান্তর করবে।
সীমাবদ্ধতা: সবচেয়ে বড় সমস্যা, ব্যাটারির ‘৭ বছর বা ৩ লাখ কিলোমিটার’ ওয়ারেন্টি বর্তমান প্রযুক্তিতে পাওয়া প্রায় অসম্ভব, কারণ অধিকাংশ নির্মাতা ৫ বছর বা ২ লাখ কিলোমিটার পর্যন্ত ওয়ারেন্টি দেয়। তিন শর্ত পূরণে কাগজপত্রের জটিলতা (সার্টিফিকেটের অনুবাদ সত্যায়ন, টাইপ অ্যাপ্রোভাল সংগ্রহ) অনেক সময় নেয়, অথচ হাতে আছে মাত্র ৩০ জুন পর্যন্ত সময়। দেশে এখনো পর্যাপ্ত দ্রুত চার্জিং স্টেশন নেই, ফলে ইভি বাস এনে কোথায় চার্জ দেওয়া হবে - সে জবাব নেই। একদম নতুন গাড়ি বাধ্যতামূলক হওয়ায় ছোট ও মাঝারি আমদানিকারকরা বিপাকে পড়েছেন, কারণ রিকন্ডিশন গাড়ি সস্তা হলেও সেটি এই সুবিধার আওতায় পড়ে না। কঠিন শর্ত ও জটিল প্রক্রিয়ার কারণে এখন পর্যন্ত বড় গ্রুপ ছাড়া আর কেউ আবেদনই করেনি, যা ব্যাপক অংশগ্রহণে বাধা সৃষ্টি করছে।
শেষ মুহূর্তের পরামর্শ
এনবিআর কর্মকর্তারা বলছেন, ১০ জুনের মধ্যে বিল অব লেডিং জেনারেট না করলে সময়মতো কাস্টমস ক্লিয়ারেন্স পাওয়া কঠিন হবে। ব্যাটারির ওয়ারেন্টির কাগজ যেন সাধারণ ব্রোশিওর না হয়, বরং প্রস্তুতকারক সংস্থার স্বতন্ত্র ও অডিটেড সার্টিফিকেট হতে হবে। টাইপ অ্যাপ্রোভাল ইংরেজি বা বাংলায় অনুবাদ করে সত্যায়িত রাখতে হবে, নইলে বন্দরে আটকে যাওয়ার ঝুঁকি আছে। যাঁরা সুবিধা নিতে চান, তাঁদের এখনই বিদেশি সরবরাহকারীর সঙ্গে চূড়ান্ত চুক্তি করে ফেলতে হবে। আশা করা যায়, সময় বাড়ানোর দাবি বিবেচনায় আসতে পারে, তবে এনবিআর এখন পর্যন্ত সে বিষয়ে কোনো ইঙ্গিত দেয়নি।