স্টাফ রিপোর্টার | ক্রাইম ক্রনিকল


বিএনপি সরকারের প্রথম চার মাসে স্থানীয় সরকার বিভাগের সড়ক, সেতু ও অবকাঠামো উন্নয়ন খাতে দেশের সবচেয়ে বেশি বরাদ্দ পেয়েছে বগুড়ার শিবগঞ্জ উপজেলা। তবে বরাদ্দের পরিমাণের পাশাপাশি প্রকল্প বণ্টনের ধরন, ঠিকাদার নির্বাচন এবং রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।


নেত্র নিউজের এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের নির্বাচনী এলাকা শিবগঞ্জে এই সময়ের মধ্যে প্রায় ৭৪ কোটি টাকার সড়ক, পথ ও সেতু উন্নয়ন প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। অথচ একই সময়ে দেশের প্রায় একশত উপজেলা কোনো প্রকল্পই পায়নি।


সরকারি তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, দেশের ৩৭৩টি উপজেলার গড় বরাদ্দ যেখানে প্রায় ৩ কোটি ৮০ লাখ টাকা, সেখানে শিবগঞ্জ একাই পেয়েছে প্রায় ২০টি উপজেলার সমপরিমাণ উন্নয়ন বরাদ্দ।


দৃশ্যমান উন্নয়ন, বাড়ছে প্রশ্নও


শিবগঞ্জে প্রবেশ করলেই বিভিন্ন এলাকায় উন্নয়ন প্রকল্পের ফলক, ব্যানার ও ফেস্টুনে প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের উপস্থিতি চোখে পড়ে। বিভিন্ন সড়ক ও অবকাঠামো প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তরে উদ্বোধক হিসেবে তার নাম রয়েছে।


কিছু প্রকল্পের ফলকে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের নামও উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে প্রতিমন্ত্রীর ছেলের প্রতিষ্ঠানের নামও দেখা গেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।



সংগৃহীত ছবি।


উদাহরণ হিসেবে গরীবপুর এলাকার একটি সরু রাস্তার কথা তুলে ধরা হয়েছে, যেখানে স্বাভাবিক যানবাহন চলাচলই কঠিন। তবুও সেখানে নতুন রাস্তা নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এমন আরও বেশ কিছু এলাকায় সড়ক ও পথ উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের তথ্য পাওয়া গেছে।


দেশের শীর্ষে বগুড়া, তারও শীর্ষে শিবগঞ্জ


সড়ক ও সেতু উন্নয়ন খাতে বরাদ্দের হিসাবে বগুড়া জেলা বর্তমানে দেশের শীর্ষে অবস্থান করছে। জেলাটিতে মোট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে প্রায় ১৩২ কোটি টাকা, যা দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা গাজীপুরের তুলনায় প্রায় ৯০ শতাংশ বেশি।


তবে সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হলো, জেলার মোট বরাদ্দের অর্ধেকেরও বেশি গেছে এককভাবে শিবগঞ্জ উপজেলায়।


একই সময়ে বগুড়ার গাবতলী উপজেলা পেয়েছে প্রায় ২০ কোটি টাকার প্রকল্প, আর জেলার বাকি ১০টি উপজেলা মিলে মোট বরাদ্দের ৩০ শতাংশেরও কম পেয়েছে।


গোপালগঞ্জের সঙ্গে তুলনা


প্রতিবেদনটিতে আওয়ামী লীগ সরকারের সময় গোপালগঞ্জকেন্দ্রিক উন্নয়ন বরাদ্দের সঙ্গে বর্তমান পরিস্থিতির তুলনা করা হয়েছে।


তথ্য অনুযায়ী, ২০১১ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত স্থানীয় সরকার বিভাগের সড়ক ও সেতু উন্নয়ন প্রকল্পে মাথাপিছু বরাদ্দের হিসাবে বগুড়ার অবস্থান ছিল ৫৯তম। একই সময়ে গোপালগঞ্জ ছিল তৃতীয় স্থানে।


নির্বাচনের আগে বগুড়ার এক জনসভায় বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে সরকার কোনো জেলা বা ব্যক্তিকেন্দ্রিক উন্নয়ন নীতি অনুসরণ করবে না। উন্নয়নের সুফল দেশের সব অঞ্চলে সমানভাবে পৌঁছে দেওয়ার কথাও তিনি বলেছিলেন।


কিন্তু সরকারের প্রথম চার মাসের বরাদ্দ কাঠামো সেই প্রতিশ্রুতির সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।


কারা পেল সবচেয়ে বেশি কাজ?


অনুসন্ধানে দেখা গেছে, শিবগঞ্জে অনুমোদিত প্রকল্পগুলোর একটি বড় অংশ গেছে প্রতিমন্ত্রীর পরিবারের সদস্য এবং বিএনপি-ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের কাছে।


সবচেয়ে বেশি কাজ পেয়েছে প্রতিমন্ত্রীর ছেলে মীর শাকরুল আলম সীমান্তের প্রতিষ্ঠান ‘মীর সীমান্ত ইঞ্জিনিয়ারিং। প্রতিষ্ঠানটি প্রায় ১৩ কোটি ৫০ লাখ টাকার কাজ পেয়েছে, যা শিবগঞ্জের মোট প্রকল্প মূল্যের প্রায় ১৮ শতাংশ।



সংগৃহীত ছবি।


মীর শাকরুল আলম সীমান্ত শিবগঞ্জ বিএনপির ছাত্রবিষয়ক সম্পাদক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন।


এছাড়া শিবগঞ্জ পৌর বিএনপির সভাপতি বুলবুল ইসলাম, উপজেলা যুবদল সভাপতি খালিদ হাসান আরমানের পরিবারের প্রতিষ্ঠান এবং বিএনপির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের কাছেও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ কাজ গেছে।


প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, শিবগঞ্জের মোট ৫২টি প্রকল্পের অন্তত ৩০টি প্রকল্প বিএনপি-সংশ্লিষ্ট অন্তত সাতটি প্রতিষ্ঠানের হাতে গেছে।


স্বার্থের দ্বন্দ্বের অভিযোগ


এ বিষয়ে প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম লিখিত বক্তব্যে বলেছেন, দায়িত্ব গ্রহণের পর তিনি বগুড়ার উন্নয়নের জন্য বিভিন্ন দপ্তরে সুপারিশপত্র দিয়েছেন। সেই প্রক্রিয়ার ফল হিসেবেই প্রকল্প বরাদ্দ এসেছে।


ছেলের প্রতিষ্ঠানের বিষয়ে তিনি দাবি করেন, নির্বাচিত হওয়ার আগেই প্রতিষ্ঠান পরিচালনার ক্ষমতা আমমোক্তারনামার মাধ্যমে অন্য একজনের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। ফলে তার বা তার পরিবারের কোনো স্বার্থ জড়িত নেই।


তবে আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, আমমোক্তারনামা কোনো প্রতিষ্ঠানের মালিকানা হস্তান্তরের দলিল নয়। এটি কেবল অন্য কাউকে প্রতিষ্ঠানের পক্ষে কাজ করার ক্ষমতা দেয়। মালিকানা ও আর্থিক স্বার্থ মূল মালিকের কাছেই থেকে যায়।


প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, আমমোক্তারনামায় মালিকানা হস্তান্তরের কোনো উল্লেখ নেই। বরং দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি মাহদী হাসান তমালকে ‘বিশ্বস্ত ও নিকটতম আত্মীয় হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তিনি স্থানীয় যুবদলের একজন নেতা বলেও জানা গেছে।


সীমিত দরপত্র নিয়ে বিতর্ক


প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন উঠেছে সীমিত দরপত্র পদ্ধতি ব্যবহার নিয়ে।


তথ্য অনুযায়ী, শিবগঞ্জের ৭৪ কোটি টাকার প্রকল্পের মধ্যে প্রায় ৫২ কোটি ৬০ লাখ টাকার কাজ সীমিত দরপত্র পদ্ধতিতে দেওয়া হয়েছে।


এই পদ্ধতিতে উন্মুক্ত প্রতিযোগিতার পরিবর্তে নির্বাচিত কিছু ঠিকাদারের কাছ থেকে দরপত্র আহ্বান করা হয়।


দুর্নীতিবিরোধী সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের পরিচালক মোহাম্মদ তৌহিদুল ইসলাম মনে করেন, বিশেষায়িত কাজের জন্য তৈরি এই পদ্ধতি বর্তমানে সাধারণ নির্মাণ কাজেও ব্যবহৃত হচ্ছে।


তার মতে, বড় প্রকল্পকে ছোট ছোট অংশে ভাগ করে সীমিত দরপত্রে নিয়ে এলে নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর মধ্যে কাজ বণ্টন করা সহজ হয়ে যায়।


৪২ কোটি টাকার প্রকল্প ভেঙে ১৬ ভাগ


অনুসন্ধানে আরও দেখা গেছে, প্রায় ৪২ কোটি টাকার একটি নগর অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পকে ১৬টি আলাদা প্যাকেজে ভাগ করা হয়।


এর মধ্যে পাঁচটি প্যাকেজ পেয়েছে মীর সীমান্ত ইঞ্জিনিয়ারিং। অন্য কয়েকটি প্যাকেজও বিএনপি-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের কাছে গেছে।


সরকারের প্রথম চার মাসে সারা দেশে সীমিত দরপত্র পদ্ধতিতে দেওয়া সবচেয়ে বড় ৫০টি সড়ক প্রকল্পের মধ্যে ১৬টিই ছিল শিবগঞ্জে।


আরও বরাদ্দের পরিকল্পনা


সড়ক ও সেতু প্রকল্পের বাইরে স্থানীয় সরকার বিভাগের অন্যান্য উন্নয়ন কর্মসূচিতেও শিবগঞ্জকে অগ্রাধিকার দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।


সম্প্রতি বগুড়া জেলা পরিষদের মাধ্যমে বাস্তবায়নের জন্য ১০ কোটি টাকার ১০টি প্রকল্পের প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে, যার সবগুলোই শিবগঞ্জকেন্দ্রিক।


এদিকে অনুসন্ধানের সময় সংশ্লিষ্ট কিছু নথি স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের ওয়েবসাইট থেকে সরিয়ে ফেলা হয়েছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।


উন্নয়ন নাকি রাজনৈতিক প্রভাব?


২৯ জানুয়ারি ২০২৬ সালে বগুড়ার এক জনসভায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছিলেন, এমন পরিস্থিতি তৈরি হওয়া উচিত নয় যাতে মানুষ মনে করে কোনো নির্দিষ্ট জেলা হওয়ার কারণে বিশেষ সুবিধা দেওয়া হচ্ছে।


কিন্তু সরকারের প্রথম চার মাসের বরাদ্দ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, শিবগঞ্জকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এই উন্নয়ন কাঠামো এখন শুধু অবকাঠামো উন্নয়ন নয়; বরং রাজনৈতিক প্রভাব, সরকারি ক্রয়ব্যবস্থার স্বচ্ছতা, স্বার্থের দ্বন্দ্ব এবং আঞ্চলিক বৈষম্যের প্রশ্নও সামনে নিয়ে এসেছে।


ফলে ‘উন্নয়নের শিবগঞ্জ মডেল’ এখন শুধু একটি উন্নয়ন গল্প নয়, বরং সরকারি বরাদ্দ ব্যবস্থার ন্যায়সঙ্গত বণ্টন নিয়ে বৃহত্তর বিতর্কেরও অংশ হয়ে উঠেছে।