বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি, রাবি | ক্রাইম ক্রনিকল
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে (রাবি) র্যাগিংয়ের ভিডিও ধারণ করার জেরে বিশ্ববিদ্যালয় প্রক্টর ও বিভাগীয় সভাপতির উপস্থিতিতে সাংবাদিকদের ওপর দফায় দফায় হামলা, মারধর ও হেনস্তার অভিযোগ উঠেছে মার্কেটিং বিভাগের একদল শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে। পরিস্থিতি সামাল দিতে গিয়ে হামলার শিকার হয়েছেন রাকসুর দুই ছাত্রনেতাও।
গত বৃহস্পতিবার (১৮ জুন) সন্ধ্যায় বিশ্ববিদ্যালয়ের রবীন্দ্র ভবনের সামনে এবং পরবর্তীতে প্রক্টর অফিসের সামনে এ ন্যাক্কারজনক ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় তীব্র নিন্দা জানিয়ে দোষীদের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি করেছে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় প্রেসক্লাবসহ অন্যান্য সাংবাদিক সংগঠনগুলো।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, মার্কেটিং বিভাগের কয়েকজন জুনিয়র শিক্ষার্থী গণমাধ্যমকর্মীদের মেসেঞ্জারে অভিযোগ করেন যে, ‘মিট-আপ’-এর নামে রবীন্দ্র ভবনের পাশের সাইকেল গ্যারেজে সিনিয়ররা তাদের দীর্ঘক্ষণ দাঁড় করিয়ে রেখে র্যাগ দিচ্ছেন। এই তথ্যের ভিত্তিতে প্রক্টরিয়াল টিমকে অবহিত করে ঘটনাস্থলে যান সাংবাদিকরা। সেখানে গিয়ে দেখা যায়, জুনিয়র শিক্ষার্থীদের পাঁচটি সারিতে দাঁড় করিয়ে রেখেছেন ইমিডিয়েট সিনিয়ররা।
এ ঘটনার ভিডিও চিত্র ধারণ করতে গেলে ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন মার্কেটিং বিভাগের সিনিয়র শিক্ষার্থীরা। তারা সাংবাদিকদের ওপর চড়াও হন এবং অকথ্য ভাষায় গালাগালি শুরু করেন। জুনিয়ররা একে র্যাগিং বললেও সিনিয়ররা তা অস্বীকার করে ‘খেলাধুলা নিয়ে আলোচনা’ বলে দাবি করেন।
ভিডিওটি ডিলিট করার জন্য সাংবাদিক ও ডেইলি ক্যাম্পাসের প্রতিনিধি মারুফ হোসেন মিশনকে চাপ দিতে থাকেন অভিযুক্ত শিক্ষার্থীরা। ভিডিও ডিলিট করতে অস্বীকৃতি জানালে তারা দফায় দফায় মারমুখী আচরণ করেন। একপর্যায়ে অন্যান্য সাংবাদিকরা সেখানে পৌঁছালে সবাইকে প্রায় দেড় ঘণ্টা অবরুদ্ধ করে রাখা হয়। খবর পেয়ে পরিস্থিতি শান্ত করতে রাকসুর এজিএস সালমান সাব্বির ও বিতর্ক ও সাহিত্য সম্পাদক ইমরান লস্কর এগিয়ে এলে মার্কেটিং বিভাগের শিক্ষার্থীরা তাদের ওপরও চড়াও হন।
খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ড. মাহবুবর রহমান, মার্কেটিং বিভাগের সভাপতি অধ্যাপক বোরাক আলী ও অধ্যাপক ড. নুরুজ্জামান। শিক্ষকরা উভয় পক্ষের সাথে কথা বলে বিষয়টি প্রক্টর অফিসে বসে সমাধানের সিদ্ধান্ত নেন।
অভিযোগ রয়েছে, উপাচার্যের নির্দেশনায় সবাই যখন প্রক্টর অফিসের দিকে রওনা হচ্ছিলেন, ঠিক তখনই "আমাদের স্যারের সামনে হাঁটছিস কেন?" এই অজুহাতে সাংবাদিক আবু বকর অনিকের মুখে থাপ্পড় ও পেটে লাথি মারেন মার্কেটিং বিভাগের শিক্ষার্থী হাবিবুর রহমান হিমেল। এরপর সামি, ওমি, আহমেদ রিয়াদ, জিহাদ, সামির ও আতিকসহ আরও কয়েকজন শিক্ষার্থী দলবদ্ধভাবে সাংবাদিকদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েন এবং এলোপাতাড়ি কিল-ঘুষি ও লাথি মারতে থাকেন।
হামলায় রাবি প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক মারুফ হোসেন মিশন, ঢাকা পোস্টের জুবায়ের জিসান, দৈনিক মানবকণ্ঠের আবু বকর অনিক এবং রাকসুর দুই নেতা গুরুতর আহত হন। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে প্রক্টর দুজনকে দ্রুত নিজের গাড়িতে তুলে নিয়ে উদ্ধার করেন।
ঘটনাস্থল ত্যাগ করার সময়ও অভিযুক্তরা সাংবাদিকদের ক্যারিয়ার ধ্বংসের হুমকি দিয়ে স্লোগান দেয়, "Marketing is a brand. This is marketing, একদম মেরে সোজা করে ফেলব।" এছাড়া ২০১৯-২০ সেশনের শিক্ষার্থী মাহমুদুল হাসান জিহাদ সাংবাদিক মিশনকে উদ্দেশ্য করে হুমকি দেন যে, পড়াশোনা শেষ হওয়ার আগে তার অবস্থা খারাপ করে ছাড়া হবে।
এই হামলায় নেতৃত্ব দেওয়া ও অভিযুক্ত শিক্ষার্থীদের মধ্যে রয়েছেন— মার্কেটিং বিভাগের ২০১৯-২০ সেশনের মাহমুদুল হাসান জিহাদ ও আতিক; ২০২২-২৩ সেশনের হাবিবুর রহমান হিমেল, ওমি ও আহমেদ রিয়াদ; ২০২৩-২৪ সেশনের সামির এবং ২০২৪-২৫ সেশনের সামি।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় প্রেসক্লাবের প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক এক বিবৃতিতে জানিয়েছেন, বিভাগের সম্মানিত শিক্ষকমণ্ডলীর সামনে এমন সন্ত্রাসী কায়দায় হামলা অত্যন্ত ন্যাক্কারজনক। মার্কেটিং বিভাগের কিছু শিক্ষার্থীর এমন অপকর্ম বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করছে। রাবি প্রেসক্লাব এই ঘটনায় জড়িত দোষীদের অনতিবিলম্বে চিহ্নিত করে সর্বোচ্চ শাস্তির জোর দাবি জানাচ্ছে। অন্যথায় বিশ্ববিদ্যালয়ের তিনটি সাংবাদিক সংগঠন যৌথভাবে কঠোর কর্মসূচি ঘোষণা করতে বাধ্য হবে।