আন্তর্জাতিক ডেস্ক | ক্রাইম ক্রনিকল
নির্বাচন বা প্রতিপক্ষকে নিয়ন্ত্রণ করা গেলেও কি মৃত্যুকে জয় করা সম্ভব? রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের বৈজ্ঞানিক উদ্যোগের পাশাপাশি এবার চীনের জিন থেরাপির অবিশ্বাস্য সাফল্য ঘিরে বিশ্বজুড়ে এখন এই প্রশ্নটিই ঘুরপাক খাচ্ছে। বার্ধক্যকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে ‘অমরত্ব’ বা দীর্ঘায়ু অর্জনের এক উচ্চাভিলাষী বৈশ্বিক রেসে একে অপরকে টেক্কা দিতে নেমেছে বিশ্বের পরাশক্তিরা।

চীনের জিন থেরাপি ও ২৫ শতাংশ আয়ু বৃদ্ধির চাঞ্চল্যকর সাফল্য
দীর্ঘায়ু ও বার্ধক্য প্রতিরোধী গবেষণায় এই মুহূর্তে বিশ্বকে চমকে দিচ্ছে বেইজিং। চীনের একাডেমি অব সায়েন্সেস (CAS) এবং দেশটির শীর্ষ ল্যাবরেটরিগুলো অমরত্ব বা সেলুলার রিজুভেনেশন (কোষের বয়স উল্টো দিকে ফিরিয়ে দেওয়া) প্রযুক্তিতে বিশাল বিনিয়োগ করেছে।
ক্যাটালেন্ট জিন থেরাপি: চীনা বিজ্ঞানীরা জিন থেরাপির মাধ্যমে ল্যাবে ইঁদুরের আয়ু ২৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়াতে সক্ষম হয়েছেন। মানুষের ওপর এর সফল প্রয়োগের জন্য বেইজিংয়ের গবেষণাগারগুলোতে এখন দিনরাত কাজ চলছে।
কোষের বয়স থামানোর প্রযুক্তি: চীনা ইনস্টিটিউট অব জুলজির গবেষকেরা এমন একটি বিশেষ জিন (kat7) নিষ্ক্রিয় করার পদ্ধতি আবিষ্কার করেছেন, যা মানব কোষের বার্ধক্যের গতিকে সম্পূর্ণ স্তব্ধ করে দিতে পারে।

রাষ্ট্রীয় অগ্রাধিকার: চীনের দ্রুত বুড়িয়ে যাওয়া জনসংখ্যা এবং শ্রমবাজার সচল রাখার কৌশলগত অংশ হিসেবেই শি জিনপিং সরকার এই অ্যান্টি-এজিং বা দীর্ঘায়ু মিশনকে সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় গুরুত্ব দিচ্ছে।
রাশিয়ার ২৬ বিলিয়ন ডলারের ‘অমরত্ব’ প্রজেক্ট
ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে প্রকাশ পেয়েছে যে, রাশিয়াতেও বার্ধক্য প্রতিরোধী গবেষণা এখন ক্রেমলিনের একটি অন্যতম শীর্ষ রাষ্ট্রীয় অগ্রাধিকার।
মেগা প্রজেক্ট ও বাজেট: রুশ সরকার ‘নিউ হেলথ প্রিজারভেশন’ নামে ২৬ বিলিয়ন ডলারের একটি বিশাল প্রকল্প ঘোষণা করেছে। এর মূল লক্ষ্য এমন জিন থেরাপি তৈরি করা যা মানব কোষের বার্ধক্যের গতি ধীর করে দেবে।
ল্যাবে মানব অঙ্গ তৈরি: ২০৩০ সালের মধ্যে থ্রিডি বায়োপ্রিন্টিং এবং জেনোট্রান্সপ্লান্টেশন (মিনি-শূকরের শরীরে মানুষের অঙ্গ উৎপাদন) প্রযুক্তির মাধ্যমে ল্যাবেই কৃত্রিম মানব অঙ্গ তৈরির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

নেতৃত্বে পুতিনকন্যা: এই বিশেষ প্রজেক্টের দেখভালের দায়িত্বে আছেন খোদ পুতিনের মেয়ে, এন্ডোক্রাইনোলজিস্ট মারিয়া ভোরন্তসোভা এবং পুতিনের ঘনিষ্ঠ পদার্থবিদ মিখাইল কোভালচুক।
সিলিকন ভ্যালির ধনকুবেরদের গোপন ও প্রকাশ্য প্রজেক্ট
মৃত্যুকে হারানো কিংবা তারুণ্য ধরে রাখার এই গোপন রেসে চীন-রাশিয়ার মতো রাষ্ট্রগুলোর পাশাপাশি আমেরিকার টেক জায়ান্ট ও সিলিকন ভ্যালির ধনকুবেররাও দীর্ঘদিন ধরে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের বাজি ধরছেন।

জেফ বেজোসের ‘অ্যাল্টোস ল্যাবস’ (যুক্তরাষ্ট্র): বিশ্বের শীর্ষ ধনী জেফ বেজোস (অ্যামাজনের প্রতিষ্ঠাতা) যৌথভাবে অর্থায়ন করেছেন ‘Altos Labs’ নামের একটি অত্যন্ত গোপনীয় ও হাই-প্রোফাইল স্টার্টআপে। প্রায় ৩ বিলিয়ন ডলারের এই প্রজেক্টের লক্ষ্য হলো 'Biological Reprogramming', যার মাধ্যমে বৃদ্ধ মানুষকে পুনরায় তরুণ করা সম্ভব হবে।
গুগলের গোপন প্রজেক্ট 'ক্যালিকো': গুগলের মূল প্রতিষ্ঠান অ্যালফাবেটের অধীনে কাজ করছে 'Calico LLC' নামের একটি রহস্যময় কোম্পানি। তাদের একমাত্র লক্ষ্য হলো মানুষের বার্ধক্যের মূল কারণ খুঁজে বের করা এবং ক্যানসার ও বয়সজনিত মরণব্যাধিগুলোর স্থায়ী সমাধান করা।
স্যাম অল্টম্যান ও পিটার থিয়েলের বাজি: ওপেনএআই এর প্রধান স্যাম অল্টম্যান 'Retro Biosciences' নামের একটি প্রতিষ্ঠানে ১৮০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছেন, যার লক্ষ্য মানুষের গড় আয়ু আরও অন্তত ১০ বছর বাড়িয়ে দেওয়া।
বৈজ্ঞানিক বাস্তবতা বনাম স্বপ্ন
চিকিৎসাবিজ্ঞানীরা বলছেন, কৃত্রিম অঙ্গ তৈরি বা গড় আয়ু কিছুটা বাড়ানো হয়তো প্রযুক্তির কল্যাণে সম্ভব, কিন্তু চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় সম্পূর্ণ 'অমরত্ব' বা মৃত্যুকে শতভাগ জয় করা এখনো এক দূরহ কল্পনা। একদিকে চীনের জিন থেরাপির যুগান্তকারী সাফল্য আর অন্যদিকে রাশিয়ার ২৬ বিলিয়নের প্রজেক্ট—বিশ্বের পরাশক্তিদের এই বিজ্ঞান যুদ্ধ মানবসভ্যতাকে কোন দিকে নিয়ে যায়, এখন সেটিই দেখার বিষয়।