নিজস্ব প্রতিবেদক | ক্রাইম ক্রনিকল
দীর্ঘ প্রায় দেড় যুগ পর জনসম্মুখে দেখা গেল সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. ফখরুদ্দীন আহমদকে। যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়ায় আয়োজিত একটি বাংলা সাহিত্য সম্মেলনে তাঁর উপস্থিতিকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে শুরু হয়েছে আলোচনা।
সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া কয়েকটি ভিডিওতে দেখা যায়, আইনজীবী, মানবাধিকারকর্মী ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক নয়ন বাঙালী ড. ফখরুদ্দীন আহমদের সঙ্গে কথোপকথনে অংশ নিচ্ছেন। এক ভিডিওতে তাঁকে বলতে শোনা যায়, “আমরা বিএনপির রাজনীতি করি, তাই এক-এগারো সরকার নিয়ে আমাদের অনেক কিছু আছে। তবু আবার আপনার সঙ্গে দেখাও হয়ে গেল।” জবাবে ড. ফখরুদ্দীনকে কেবল হাসতে দেখা যায়।
ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ার পর রাজনৈতিক মহলে নানা ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ শুরু হয়েছে। কেউ এটিকে নিছক সৌজন্য সাক্ষাৎ হিসেবে দেখছেন, আবার কেউ এর ভেতরে নতুন রাজনৈতিক সমীকরণের ইঙ্গিত খুঁজছেন।
নয়ন বাঙালী, যিনি নয়ন বাঙ্গালী নামেও পরিচিত, বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্টের একজন আইনজীবী। পাশাপাশি তিনি আন্তর্জাতিক মানবাধিকারকর্মী, গবেষক, সমাজকর্মী ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক হিসেবে পরিচিত। তিনি ‘রাজনীতির স্কুল’ নামের একটি রাজনৈতিক ও সামাজিক সচেতনতামূলক প্ল্যাটফর্মের প্রতিষ্ঠাতাও।
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে তিনি রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হয়েছেন বলে বিভিন্ন সময়ে দাবি করেছেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, তাঁর বিরুদ্ধে ৪২টি রাজনৈতিক মামলা দায়ের করা হয়েছিল। এছাড়া ওয়ান-ইলেভেন সরকারের সময়ও তিনি গ্রেপ্তার ও নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন বলে বিভিন্ন টকশো ও আলোচনায় উল্লেখ করেছেন।
রাজনৈতিকভাবে তিনি দখল ও চাঁদাবাজমুক্ত রাজনীতির পক্ষে সরব অবস্থানের জন্য পরিচিত। সাম্প্রতিক সময়ে ঢাকা-১৬ আসন কেন্দ্রিক নির্বাচনী প্রচারণা ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডেও তাঁকে সক্রিয় দেখা গেছে।
২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারির রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব নেন সাবেক বাংলাদেশ ব্যাংক গভর্নর ড. ফখরুদ্দীন আহমদ। তাঁর নেতৃত্বাধীন সরকার দুর্নীতিবিরোধী অভিযানের অংশ হিসেবে দেশের প্রধান দুই রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতৃত্বের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেয়। ওই সময় গ্রেপ্তার হন আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা ও বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। বিএনপির বর্তমান শীর্ষ নেতা তারেক রহমানও গ্রেপ্তার ও নির্যাতনের শিকার হন বলে দলটির অভিযোগ।
ওয়ান-ইলেভেন সরকারের সময় ‘মাইনাস টু’ ফর্মুলার মাধ্যমে দেশের দুই প্রধান রাজনৈতিক নেত্রীকে রাজনীতির বাইরে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা হয়েছিল—এমন অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরেই রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচিত। যদিও তৎকালীন সরকার কখনো আনুষ্ঠানিকভাবে এমন পরিকল্পনার কথা স্বীকার করেনি।
ফলে ড. ফখরুদ্দীন আহমদের সঙ্গে নয়ন বাঙালীর হাস্যোজ্জ্বল কথোপকথনের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। বিএনপির একটি অংশের নেতাকর্মী বিষয়টিকে অস্বস্তিকর হিসেবে দেখছেন। অন্যদিকে কেউ কেউ বলছেন, রাজনৈতিক বাস্তবতায় অতীতের তিক্ততা পেছনে ফেলে সৌজন্যপূর্ণ আচরণ অস্বাভাবিক নয়।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘদিন আড়ালে থাকা ড. ফখরুদ্দীন আহমদের হঠাৎ প্রকাশ্যে আসা এবং তা ঘিরে রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া দেশের সমসাময়িক রাজনৈতিক বাস্তবতাকেই সামনে নিয়ে এসেছে। বিশেষ করে ওয়ান-ইলেভেনের স্মৃতি এখনও বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক সংবেদনশীল অধ্যায় হিসেবেই বিবেচিত হয়।