স্টাফ রিপোর্টার | ক্রাইম ক্রনিকল


কিশোরগঞ্জের ভৈরব রেলস্টেশন এলাকায় দুই পক্ষের মধ্যে চলা সংঘর্ষ অবশেষে ৬ ঘণ্টা পর নিয়ন্ত্রণে আনে প্রশাসন। শুক্রবার (৫ জুন) রাত দেড়টার দিকে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে শুরু করে। রাত ১টা ৫০ মিনিটে চট্টগ্রাম থেকে ছেড়ে আসা ঢাকাগামী মহানগর গোধূলি ট্রেন চলাচলের মধ্য দিয়ে ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক হয় বলে জানান ভৈরব রেলওয়ে স্টেশন মাস্টার আবু ইউসুফ।


এতে পুলিশের ৮ সদস্যসহ অন্তত ৩০ জন আহত হয়েছেন। সংঘর্ষের জেরে ঢাকা-চট্টগ্রাম ও ঢাকা-সিলেট প্রধান রেলপথে ট্রেন চলাচল প্রায় ৬ ঘণ্টা বন্ধ ছিল।


যেভাবে শুরু হয় সংঘর্ষ


স্থানীয় সূত্র ও প্রশাসন জানায়, প্রায় ১৫ দিন আগে পৌর এলাকার পঞ্চবটী ও জগন্নাথপুরের ছেলেদের মধ্যে ফুটবল খেলা নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়। সেই ঘটনার জের ধরে বৃহস্পতিবার (৪ জুন) সন্ধ্যা ৭টার দিকে জগন্নাথপুরের লিয়াম (১৭) নামে এক কিশোরকে পঞ্চবটী এলাকার ছেলেরা হামলা করে আহত করে। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করেই রাতে রেলস্টেশনে সংঘর্ষের সূত্রপাত। রাত নামতেই পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নেয় – দুই পক্ষের সংঘর্ষ চলে প্রায় পাঁচ ঘণ্টা।


রেলপথ অবরোধ, থমকে যাওয়া ট্রেন


সংঘর্ষের এক পর্যায়ে এক পক্ষ রেললাইন অবরোধ করে বসে। এর ফলে ঢাকা-চট্টগ্রাম ও ঢাকা-সিলেট – দুটি প্রধান রেলপথেই ট্রেন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। শুক্রবার দিবাগত রাত ১২টা ১৫ মিনিটের দিকে (৫ জুন) রেলপথ মন্ত্রণালয় থেকে পাঠানো বার্তায় এ তথ্য নিশ্চিত করা হয়।


আটকে থাকা ট্রেনগুলোর মধ্যে ছিল চট্টগ্রাম থেকে আসা মহানগর গোধূলি, সিলেট থেকে আসা পারাবত এক্সপ্রেস, ঢাকা থেকে কিশোরগঞ্জগামী এগারোসিন্ধুর গোধূলি, ঢাকা থেকে চট্টগ্রামগামী মহানগর এক্সপ্রেস, ঢাকা থেকে ভৈরবগামী নরসিংদী কমিউটার


শত শত যাত্রী রাতভর ট্রেনের ভেতর ও স্টেশন এলাকায় আটকে থাকেন। অনেকেই প্রাণ বাঁচাতে দৌড়ে নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নেন।


উদ্ধার ও নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা


ঘটনার সংবাদ পেয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রেল পুলিশ, ভৈরব থানা পুলিশ, র‍্যাব, রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনী ও সেনাবাহিনীর শতাধিক সদস্য ঘটনাস্থলে মোতায়েন করা হয়। যৌথবাহিনীর সম্মিলিত প্রচেষ্টায় কয়েক দফা চেষ্টার পর সংঘর্ষ থামানো সম্ভব হয়।


ভৈরব রেলওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবু সাইদ জানান, কয়েক দফা চেষ্টার পর তারা সংঘর্ষ নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হয়েছেন। অন্যদিকে, রাত ২টায় ভৈরব উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এ কে এম মামুনুর রশিদ সার্বিক পরিস্থিতি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রয়েছে বলে নিশ্চিত করেন। তিনি স্পষ্ট বার্তা দিয়ে বলেন, "যারা রাষ্ট্র ও রেলের সম্পত্তি ক্ষতিসাধনের সঙ্গে জড়িত, তাদেরকে আইনের আওতায় আনা হবে।" 


একটি স্থানীয় খেলার দ্বন্দ্ব কীভাবে পুরো দেশের রেল যোগাযোগ ব্যবস্থাকে হুমকির মুখে ফেলতে পারে?


একটি ফুটবল খেলা কিংবা ছেলেদের হাতাহাতির ঘটনা কেন দেশের গুরুত্বপূর্ণ রেলপথ বন্ধ করে দেওয়ার মতো বড় সংকট তৈরি করে? আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরাও সংঘর্ষে আহত হচ্ছেন; সেনাবাহিনী মোতায়েন করেও পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ আনতে সময় লেগেছে। এ কি শুধুই স্থানীয় দ্বন্দ্ব, নাকি প্রশাসনের পূর্বপ্রস্তুতির ঘাটতি ও সমাজের গভীর বিভাজনের বহিঃপ্রকাশ?


যাত্রীদের ভোগান্তি তো আছেই – রোগী, নারী, শিশু ও বয়স্করা রাতভর ট্রেনে অবরুদ্ধ। পণ্য পরিবহন বন্ধ থাকায় অর্থনৈতিক ক্ষতিও অনিবার্য। এই ধরনের ঘটনা বারবার যেন স্বাভাবিক হয়ে যাচ্ছে – এটাই সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয়। প্রশাসন ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের এখন দ্রুত ও কার্যকর হস্তক্ষেপ প্রয়োজন। অন্যথায় খেলার মাঠের বিবাদ থামাতে গিয়ে রেললাইনের বিবাদ থামানো যাবে না।