ক্রাইম ক্রনিকল ডেস্ক | চট্টগ্রাম


সম্পত্তি নিয়ে দীর্ঘদিনের বিরোধের জেরে এক বাবুর্চিকে প্রেমের ফাঁদে ফেলে হত্যা করার চাঞ্চল্যকর ঘটনা উদ্ঘাটন করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। হত্যাকাণ্ডের পর মরদেহ বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন করা হলেও প্রায় দুই বছর পর পিবিআইয়ের তদন্তে নিহতের পরিচয় শনাক্ত হয়। এ ঘটনায় নিহতের ছেলে ও তার এক সহযোগীকে গ্রেফতার করা হয়েছে। আদালতে ছেলে বেলাল হোসেন হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছেন।


পিবিআই সূত্রে জানা যায়, ফটিকছড়ির বাসিন্দা ও পেশায় বাবুর্চি মীর মজিবুর রহমান খান (৬০) গত ৬ জুন ২০২৪ তারিখে চট্টগ্রাম নগরীর আন্দরকিল্লায় কোতোয়ালী থানা এলাকায় মেয়ের বাসায় বেড়াতে আসেন। পরদিন ৭ জুন সকাল আনুমানিক ১০টার দিকে এক নারীর ফোনকল পেয়ে বাঁশখালী যাওয়ার কথা বলে তিনি বাসা থেকে বের হন। এরপর থেকেই তিনি নিখোঁজ ছিলেন।


বাবার খোঁজ না পেয়ে তার মেয়ে সালমা খানম ৮ জুলাই ২০২৪ তারিখে কোতোয়ালী থানায় একটি নিখোঁজ ডায়েরি করেন। পরবর্তীতে ৬ নভেম্বর ২০২৪ তারিখে অপহরণের অভিযোগে আদালতে সিআর মামলা দায়ের করেন। আদালতের নির্দেশে পিবিআই চট্টগ্রাম মেট্রো মামলাটির তদন্তভার গ্রহণ করে। তদন্তের একপর্যায়ে পিবিআইয়ের আবেদনের ভিত্তিতে ৩ সেপ্টেম্বর ২০২৫ তারিখে কোতোয়ালী থানায় ৩৬৫ ধারায় জিআর মামলা রুজু করা হয়।

তদন্ত চলাকালে তথ্যপ্রযুক্তি ও গোয়েন্দা তথ্যের সহায়তায় পিবিআই গত ১৩ জুন ২০২৬ বিকেলে কর্ণফুলী থানার মইজ্জারটেক এলাকা থেকে নিহতের ছেলে বেলাল হোসেনকে গ্রেফতার করে। জিজ্ঞাসাবাদে তিনি হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেন।


বেলালের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে তদন্তকারীরা জানতে পারেন, ঘটনার সময় হালিশহর থানা এলাকার একটি অজ্ঞাত মরদেহ বেওয়ারিশ হিসেবে উদ্ধার করে আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামের মাধ্যমে দাফন করা হয়েছিল। বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত যাচাই-বাছাই করে পিবিআই নিশ্চিত হয়, সেই বেওয়ারিশ মরদেহই ছিল নিখোঁজ মীর মজিবুর রহমান খানের। প্রায় দুই বছর পর এভাবেই নিহতের পরিচয় শনাক্ত করতে সক্ষম হয় সংস্থাটি।

পরবর্তীতে বেলালের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ১৪ জুন ২০২৬ ভোরে চট্টগ্রামের জোরারগঞ্জ থানার ঘেড়ামারা গ্রাম থেকে তার সহযোগী আব্দুল জলিলকে গ্রেফতার করা হয়।


পিবিআইয়ের তদন্ত ও আদালতে দেওয়া বেলাল হোসেনের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি থেকে বেরিয়ে আসে হত্যার নেপথ্যের ভয়াবহ পরিকল্পনা। তদন্তে জানা যায়, পৈত্রিক সম্পত্তি নিয়ে বিরোধের কারণে বেলাল তার পিতার প্রতি ক্ষুব্ধ ছিলেন। তিনি আশঙ্কা করতেন, তার বাবা তাকে সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করবেন এবং অবশিষ্ট জমিও বিক্রি করে দিতে পারেন।


এই ক্ষোভ থেকেই তিনি পূর্বপরিকল্পিতভাবে হত্যার ছক আঁকেন। পরিকল্পনার অংশ হিসেবে এক পরিচিত নারীর মাধ্যমে মীর মজিবুর রহমান খানের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে তোলা হয়। ঘটনার দিন ওই নারী বাকলিয়া এলাকার বাসায় ডেকে নিয়ে শরবতের সঙ্গে ঘুমের ওষুধ খাইয়ে তাকে অচেতন করেন। পরে বেলাল হোসেন ও সহযোগী আব্দুল জলিল অচেতন মজিবুর রহমানকে হালিশহর এলাকায় নিয়ে গিয়ে গামছা পেঁচিয়ে শ্বাসরোধে হত্যা করে। হত্যার পর মরদেহ জঙ্গলে ফেলে পালিয়ে যায় তারা।


পিবিআই জানিয়েছে, ঘটনার সঙ্গে আরও কেউ জড়িত আছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। মামলার তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।


একটি নিখোঁজ ডায়েরি থেকে শুরু হওয়া তদন্ত শেষ পর্যন্ত রূপ নেয় পরিকল্পিত পিতৃহত্যার মামলায়। বেওয়ারিশ লাশ দাফনের প্রায় দুই বছর পর প্রযুক্তিনির্ভর তদন্ত ও গোয়েন্দা তৎপরতায় হত্যার রহস্য উদ্ঘাটন করে পিবিআই, যা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অনুসন্ধানী সক্ষমতার এক উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।