নিজস্ব প্রতিবেদক | ক্রাইম ক্রনিকল
সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যবাহী জেলা ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় এক অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতিতে বন্ধ হয়ে গেছে নির্মাতা তানিম নূর পরিচালিত বহুল আলোচিত চলচ্চিত্র ‘বনলতা এক্সপ্রেস’-এর বিশেষ প্রদর্শনী। জেলার স্থানীয় কওমি মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের একাংশের কড়া আপত্তি ও ভার্চুয়াল প্রতিবাদের জেরে এই সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছেন আয়োজকেরা। সেন্সর বোর্ডের আনুষ্ঠানিক অনুমোদন থাকার পরও এমন বাধার মুখে ভেন্যু বাতিল হওয়াকে ঘিরে স্থানীয় মুক্তমনা ও চলচ্চিত্র অনুরাগীদের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।

সুর ও সাহিত্যের চারণভূমিতে সংস্কৃতির কণ্ঠরোধ!
যে ব্রাহ্মণবাড়িয়া সুরসম্রাট ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ ও ওস্তাদ আয়াত আলী খাঁর রাগ-রাগিণী, ওস্তাদ বাহাদুর হোসেন খাঁর শাস্ত্রীয় সঙ্গীত এবং অদ্বৈত মল্লবর্মণের কালজয়ী উপন্যাস ‘তিতাস একটি নদীর নাম’-এর মধ্য দিয়ে বিশ্বজুড়ে অনন্য এক অসাম্প্রদায়িক সাংস্কৃতিক রাজধানী হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে, সেই মাটিতে আজ একটি চলচ্চিত্রের প্রদর্শনী উগ্র বাধার মুখে থমকে যাওয়াকে চরম বিপর্যয় হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। কবি আল মাহমুদ, কায়কোবাদ কিংবা ঐতিহ্যবাহী বিপিন পালের পুতুলনাচের এই পুণ্যভূমিতে সুস্থ বিনোদনের পথ এভাবে অবরুদ্ধ হওয়া কোনোভাবেই কাম্য নয় বলে মনে করছেন স্থানীয় সুশীল সমাজ।
ভার্চুয়াল রেষারেষি ও কওমিদের অনমনীয় অবস্থান
পবিত্র ঈদুল আজহার আনন্দ উদযাপনের অংশ হিসেবে ৩০ মে (শনিবার) বিকেল ৩টায় শহরের ঐতিহ্যবাহী অন্নদা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে একটি বিশেষ প্রদর্শনীর আয়োজন করেছিল জেলা ছাত্রসমাজ ভিত্তিক মঞ্চ ‘ব্রাহ্মণবাড়িয়া ফিল্ম সোসাইটি’। তবে দিনকয়েক আগে থেকেই এই উদ্যোগের বিপক্ষে অবস্থান নেয় কওমি ছাত্র ঐক্য পরিষদের একটি বড় অংশ।

কওমি ঘরানার তরুণ সংগঠনটির অন্যতম নেতা হাফেজ নাসরুল্লাহ মুয়াজ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সিনেমার প্রচারণামূলক ফটোকার্ডে লাল ক্রস চিহ্ন দিয়ে একটি পোস্ট দেন। সেখানে তিনি লেখেন, আল্লামা ফখরে বাঙ্গাল (রহ.)-এর পুণ্যভূমি এই আলেম-ওলামার শহরে নতুন করে সিনেমার পুনরুত্থান রুখে দেওয়া হবে। একই সাথে বাদ জোহর জামিয়া ইসলামিয়া ইউনুছিয়া মাদরাসায় কওমি ঐক্য পরিষদের উপদেষ্টা মাওলানা আলী আজমের উপস্থিতিতে এক বিশেষ বৈঠকে সিনেমার প্রদর্শনী প্রতিহত করতে মাদরাসা চত্বরে সতর্কতামূলক অবস্থান নেওয়ার হুশিয়ারি দেওয়া হয়।
আয়োজকদের হতাশা ও প্রশাসনের ব্যাখ্যা
ঘটনার মোড় ভিন্ন দিকে মোড় নেওয়ায় এবং সম্ভাব্য হামলা বা অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে অন্নদা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মোসাম্মৎ সাবিনা ইয়াসমিন সিনেমাটির প্রদর্শনী বাতিলের ইঙ্গিত দেন। শেষ মুহূর্তে বিকল্প কোনো মিলনায়তন বা ভেন্যু না পেয়ে শুক্রবার রাতেই প্রেস রিলিজের মাধ্যমে সাময়িকভাবে শো স্থগিত করার ঘোষণা দেয় আয়োজক কমিটি।
সংগঠনটির অন্যতম নীতি-নির্ধারক বখতিয়ার শাহরিয়ার দুঃখ প্রকাশ করে গণমাধ্যমকে জানান, "আমরা আইনি পথ মেনেই সব ধরনের প্রস্তুতি নিয়েছিলাম। কিন্তু একটি নির্দিষ্ট মহলের তোপের মুখে এবং প্রশাসনের কাছ থেকে আশানুরূপ কোনো নিরাপত্তা বা সহযোগিতা না পাওয়ায় আমরা আমাদের দর্শকদের কাছে দুঃখ প্রকাশ করতে বাধ্য হয়েছি। কোনো কনটেন্ট যদি কারও ভালো না লাগে, তিনি সেটি বর্জন করতে পারেন; কিন্তু অন্যের দেখার স্বাধীনতায় দেয়াল তুলে দেওয়া কোনো সুস্থ সমাজের লক্ষণ নয়।"
অন্যদিকে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে জেলা প্রশাসক মো. আবু সাঈদ জানান, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া পাল্টাপাল্টি উত্তেজনা ও সংঘাতের আশঙ্কা বিবেচনায় নিয়েই এই মুহূর্তে বিশৃঙ্খলা এড়াতে প্রদর্শনীটি সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে বলা হয়েছে।